সেহেরির পর থেকে ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। শহরের পেট্রাল পাম্পগুলোর সামনে লম্বা লাইন। মোটর সাইকেল, মাইক্রোবাস – যেন একটা মিছিল দাঁড়িয়ে আছে। একজন বাইকারকে বলতে শোনা গেল ফুল ট্যাঙ্ক তেল দেন। অপর একজন বাস চালক বলতে শোনা গেল একটা ড্রামেও তেল দিন। বাসায় রেখে দেব। পাম্পের কর্মচারি অবাক। সাধারণত যে পরিমাণ তেল একদিনে বিক্রি হয়, একদিনে তিনগুন তেল বিক্রি হয়ে গিয়েছে। এটা শুধু একটা পাম্পের গল্প নয়। এটা এখন বাংলাদেশের প্রতিটি পেট্রোলপাম্পের গল্প। কেই প্রয়োজনের জন্য কিনছে, কেউ আতঙ্ক থেকে কিনছে। শুধু পেট্রোল বা ডিজেল নয়। সয়াবিন তেলেরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সেই বিষয়ে আলোকপাত করার আগে বাংলাদেশের ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরা যাক। যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ব্যারল প্রতি ১১০ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে সোনার দামে ঘটেছে পতন। পতন হয়েছে দুই শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আবহে চড়চড়িয়ে বাড়ছে ডলারের দাম। মার্কিন বাজার বিশেষজ্ঞ টনি সিকামোর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনও লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। দুই পক্ষই এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে নারাজ। বাজারে এর ফল দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইংরাজিতে একটি কথা আছে “Panic Buying”। অর্থাৎ ভয় বা আতঙ্ক থেকে ক্রয় করা। এই ধরনের কেনাকাটা এমন এক ধরনের আচরণ যখন মানুষ কোনও দুর্যোগ বা সম্ভাব্য দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে কেনাকাটা করে। প্রশ্ন হল এই সংকট কি বাস্তবিক? না কি এই সংকট তৈরি করা হয়েছে? অর্থাৎ কৃত্রিম সংকট?
ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়। ২০২০ সালে অতিমারির সময়। আমেরিকায় হঠাৎ করে বিক্রি বেড়ে যায় টয়লেট টিসু কিনতে শুরু করে। দোকানের তাক খালি হতে শুরু করে। বাংলাদেশেও তখন একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। মানুষ আতঙ্কে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক কিনতে শুরু করে। করোনার হাত থেকে বাঁচতে যা যা কেনার দরকার মানুষ সেই সব হামলে পড়ে কিনতে শুরু করে। কয়েক মাসের জিনিসপত্র একসঙ্গে কিনে ফেলে। ফলাফল কী দেখা গেল? প্রয়োজনের জন্য যারা কিনতে গিয়েছিল, তাদের খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। আজ জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও একই মনস্তত্ত্ব কাজ করছে। ভয় আসলে সঙ্কট তৈরি করে। পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে বাদল সরকারের “ত্রিংশ শতাব্দি” নাটকের সেই বিখ্যাত সংলাপ – “ ভয়ে মানুষের বুদ্ধি লোপ পায়, ভয়ে মানুষের চেতনা জাগে। এই ভয় মানুষকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে বেডা়চ্ছে। ”
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। একে বলা হয় Self full filling sortage. ধরা যাক মানুষ শুনল তেল শেষ হয়ে যাবে। সবাই মিলে তখন তেলে কেনা শুরু করল। পাম্পে তেল দ্রুত শেষ হয়ে গেল। তখন সবাই বলল সত্যি তেল হয়ে যাচ্ছে। অর্থাংৎ সংকটের ভয়ে সংকট তৈরি করা। যে সমস্যা হয়তো এতটা বড়ো ছিল না শুধুমাত্র আতঙ্কের কারণে সেটা বড়ো আকার ধারণ করল। এটা অনেকটা Bank Run য়ের মতো। সবাই যদি ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে শুরু করে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংকের গচ্ছিত তহবিল ফাঁকা হয়ে যাবে। আর সব চেয়ে শক্তিশালী ব্যাংকও ভয়াবহ বিপদে পড়তে পারে। জ্বালানি বাজারেও ঠিক একই নিয়ম কাজ করে।
প্রশ্ন হল কেন এই আতঙ্ক? এই আতঙ্কের পিছনে কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। বিশ্বরাজনীতিতে এখন অস্থিরতা চলছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। পৃথিবীর বড়ো অংশের তেল এই অঞ্চল থেকে আসে। বাংলাদেশও জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভর। তাই, আন্তর্জাতিকবাজারে সমস্যা তৈরি হলে দেশের বাজারেও সমস্যা তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবতা হল প্রকৃত ঘাটতির চেয়ে গুজব এবং আতঙ্ক বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে।












Discussion about this post