আমাদের আশেপাশে এমন বহু মানুষ আছেন, যারা কোনও কিছু একটা ইস্যু পেলে সানাইয়ের পোঁ ধরে বসে থাকেন। সানাইয়ের পোঁ বলতে বোঝায় কী? মূল শিল্পীর পাশে কয়েকজন সানাই নিয়ে বসে থাকেন। তাদের কাজ হল শিল্পী যেটা করবেন, সেটাই তারা করবেন একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়। সেটাকে বলা হয় সানাইয়ের পোঁ ধরা। পদ্মাপারের পদলোভী ইউনূস বিদায় নিয়েছেন। তিনি তাঁর প্রিয় “ দেশোবাসীর” উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন সেটা ওই সানাইয়ের পোঁ ধরার মতন। গণতন্ত্র ফেরাতে তিন চরম ব্যর্থ। সংখ্যালঘুদের ওপর লাগাতার নির্যাতন হয়েছে। বিদায়রজনীতে নিজের ১৮ মাসের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য বেছে নিলেন সেভেন সিস্টার্স। বেছে নিলেন কড়া জাতীয়তাবাদ ও ভূ রাজনৈতিক উস্কানির পথ। তিনি তাঁর বিদায়ী ভাষণে আরও একবার উল্লেখ করলেন উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা সেভেন সিস্টার্স। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা প্রকল্প নিয়ে মন্তব্য দিল্লির পক্ষে উদ্বেগ তৈরি করল।
ভাষণের শুরু থেকে বিদায়ী তদারকি প্রধান ইউনূস দাবি করেন, বাংলাদেশ এখন কারও নির্দেশে চলে না। সেই সঙ্গে তাঁর দাবি, তাঁর আমলে দেশ পূর্ণ সার্বোভৌমত্ব ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেছে। বিতর্ক দানা বাঁধে তখন যখন তিনি নেপাল ও ভুটানের পাশাপাশি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিকে একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক বলয় হিসেবে তুলে ধরেন। ভারতের নিজস্ব কানেক্টিভিটি প্রজেক্টের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে তিনি কার্যত বোঝাতে চেয়েছেন যে সেভেন সিস্টার্সের ভবিষ্যৎ এখন থেকে বাংলাদেশের বন্দর ও কৌশলী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। শিলিগুড়ি করিডোরের পাশেই চিনের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও নীলফামারিতে আন্তর্জাতিক হাসপাতাল তৈরির ঘোষণা ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশেষ সামরিক আধুনিকীকরণের মাধ্যমে ‘আগ্রাসন ঠেকানোর’ যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, সেটা ভারতকে লক্ষ্য করেই বলে মনে করছে রাজনৈতিকমহল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশ সচল হয়েছে দাবি করে বিদায়ী সরকার প্রধান বলেন, “ যারা দেশকে লুটেপুটে খেতেন তাদের অনুগতেরা অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে পালিয়েছেন। ” পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের শহিদ ও আহতদের ত্যাগকে কুর্নিশ জানাতে ভোলেননি মুহাম্মদ ইউনূস। জানান, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে প্রণয়ন ও সংস্কার হয়েছে ১৩০টি আইন। ৬০০টি নির্দেশ জারি করা হয়েছে, তার মধ্যে ৮৪ শতাংশের বেশি কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে তাঁর পরামর্শ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততার ওপর জোর দেওয়া দরকার। তিনি বলেন, “আমি আমার সহকর্মীরা – সবাই আমরা সেই অঙ্গীকার রক্ষার চেষ্টা করে গিয়েছি। কোথায়, কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি, সে বিচারের ভার থাকল আপনাদের ওপর। ”
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভাষণে বলেন, “গত ১৮ মাসে ক্রমান্বয়ে এদেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, একটি কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা, বাক স্বাধীনতা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারা, সমালোচনা করতে পারা, জবাবদিহিতায় আনতে পারার যে চর্চা শুরু হল, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের অধিকার নিশ্চিত হল। এই ধারা যেন কোনওরকমেই হাতছাড়া না হয়ে যায়। ”
সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ইউনূসের ভাষণে ছিল চরম উদাসীনতা। মন্দিরে ভাঙচুর, হিন্দুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা এবং উগ্রপন্থীদের দাপট রুখতে তাঁর সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে তিনি একটি শব্দ খরচ করেননি। সমালোচকদের মতে, দেশের মাটিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরাতে না পারার ব্যর্থতা স্বীকার করলে তিনি আর কোথাও মুখ দেখাতে পারতেন না। প্রশ্ন, তাঁর এই ভাষণ আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে? যেটা আরও বেশি করে কানে লাগছে, তা হল তাঁর দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি। শনিবার নিজের বক্তব্য পেশের সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব থেকে তিনি অব্যাহতি নিলেও দেশের অন্য নাগরিকদের মতো তিনিও নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব পালন করবেন।












Discussion about this post