অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম দেশ ছাড়েন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি পদত্যাগ করেননি। তিনি বিদেশ গিয়েছিলেন ছুটি কাটাতে। তারপর আর তিনি দেশে ফিরে আসেননি। দেশে ছাড়ার পর ফেসবুকে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি লেখেন, আমি এক টাকাও দুর্নীতি করিনি এবং নিজের কাছে সৎ রয়েছি। প্রশ্ন এখানেই। তিনি সৎ থাকলে দেশে ফিরছেন না কেন? কেন আচমকা তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন? অনেক গুজব আছে।
ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন কালে তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। তিনি মোবাইল কোম্পানির থেকে মোটা টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। অভিযোগ তেমনই। বিদেশ থেকে মোবাইল আমদানির ওপর তিনি আচমকা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। অবৈধ ফোন বন্ধের নামে বৈধ ব্যবসায়ীদের হয়রানি করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকী “বেয়াড়া” ব্যবসায়ীদের তিনি গ্রেফতারও করেছিলেন। মোবাইল ব্যবসায়ীরা রীতিমতো ক্ষোভে ফুঁসছেন। এই সব কারণে তৈয়বের ওপরে জারি করা হয়েছিল বিদেশে যাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা। আর তৈয়ব বলছেন, তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ ভিত্তিহীন। এর কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই। ব্যবসায়ীরা আসলে অপরাধের লাইসেন্স চাইছেন। সেটা তাঁর সরকার দিতে চাইছে না বলে তারা ক্ষোঁভে ফুঁসছে। আসল সত্য কি? তৈয়ব কি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার? না কি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সত্য? তিন জায়গা থেকে অর্থ সরিয়েছেন বলে তৈয়বের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস “নগদ” য়ের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সেখানে নিজস্ব লোক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে পূর্বতন তদারকি সরকারের এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত সহকারী আতিক মোর্শেদকে ঘুঁটি সাজিয়ে এই খাত থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সরিয়েছেন বলে অভিযোগ। বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক প্রকল্প ব্যয় ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে এই তৈয়বের হস্তক্ষেপে কোনও কারণ ছাড়াই প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৩২৬ কোটি টাকা করা হয়। বাড়তি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে এই প্রাক্তন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। লাইসেন্স বাণিজ্যেও তিনি বড় রকমের দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টেলিকম সেক্টরে বিভিন্ন লাইসেন্স দেওয়া ও লাইসেন্স পুনর্বিকরণের মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন এই উপদেষ্টা।
তৈয়বের বিরুদ্ধে সব থেকে বেশি অভিযোগ যে খাতে, সেটি হল মুঠোফোন। মোবাইল ফোনের আমদানি থেকে শুরু করে, নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ এই সেক্টর থেকে তৈয়ব সাড়ে পাঁচশো কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন। অভিযোগ তেমনই। বাংলাদেশের মোবাইল ফোনের বার্ষিক ব্যবসা প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকা মোবাইল ফোন সেট বিক্রি করে আয়, বাকিটা মোবাইল ফোন অপারেটরদের থেকে আসে। এর মধ্যে গ্রামীণ ফোনের আয়, ২০২৩ সালের হিসেব অনুযায়ী, ছিল ১৬ হাজার কোটি টাকা। অপারেটর রবির আয় ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। অপারেটর বাংলা লিঙ্ক, এয়ারটেল টেলিটক প্রমুখের আয় তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মোবাইল ফোনের বাজার এখন ৬০ হাজার কোটি টাকার। এই বাজার দেশীয় কোম্পানি, বিদেশি ব্র্যান্ড এবং স্থানীয় কারখানা এই তিনকে নিয়ে। ২০২৫-২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাজারে বিক্রিতে শীর্ষে আছে সাওমি এবং স্যামসং। তাদের ঠিক পরেই ভিবো, রিয়েলমি এবং অপো। বাংলাদেশের মোবাইল বাজারের অধিকাংশ এখন চিনের দখলে। এই সব কোম্পানি বাংলাদেশে ফোন রিঅ্যাসেম্বেল করে। অর্থাৎ, তারা তাদের দেশ থেকে মোবাইলের বিভিন্ন পার্টস নিয়ে এসে বাংলাদেশে অ্যাসেম্বল করে। এখানে তৈয়বের চালাকি বা ক্যারিশমা।
২০২৫-য়ের নভেম্বরে তৈয়ব বিটিআরসির মাধ্যমে National equipment identity register চালু করেন। এর আওতায় অবৈধভাবে আমদানি করা, চোলাচালানের মাধ্যমে আনা এবং ক্লোন করা মোবাইল ফোন বন্ধর ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে, ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা রাস্তায় নামেন। তারা তৈয়বের পদত্যাগের দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, মোটা টাকার বিনিময়ে বিদেশি কোম্পাগুলির সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে যাতে দেশের মোবাইল কোম্পানিগুলি ব্যবসা করতে না পারে। একপ্রকার চাপে পড়ে তৈয়বকে দেশ ছাড়তে হয়েছে।












Discussion about this post