ক্রমশ পশ্চিমমুখী হতে শুরু করেছে মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশ। পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ বিগত সরকারগুলির আমলে বাংলাদেশের কূটনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং সামরিক সহায়তা সবকিছুই ঘোরাফেরা করতো প্রতিবেশী ভারত ও চিনের মধ্যে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে মূলত পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বলতে রেডিমেড পোশাক রফতানি। কিন্তু সেটাও এখন তলানিতে। এখন বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাঁরাই এখন বাংলাদেশের কূটনীতি প্রণোয়ন করছে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধি করতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ক্রমাগত ভারত বিরোধী মন্তব্য, ভারত বিরোধী কাজকর্মের মাধ্যমে পরিবেশ ও পরিস্থিতি বদলে দেয় ইউনূসের উপদেষ্টামণ্ডলীর কয়েকজন সদস্য। পরবর্তী সময় স্বয়ং মুহাম্মম ইউনূসও সেভেন সিস্টার্স নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত ছিন্ন করতে চেয়েছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু কেন নতুন বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ বলছেন, মুহাম্মদ ইউনূস মার্কিন ডিপ স্টেটের সদস্য হিসেবে তাঁদেরই হয়ে কাজ করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বতন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ডিপ স্টেট বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি নির্মানের উদ্দেশ্যে বৃহত্তর ষড়যন্ত্র রচনা করেছিলেন। তারই অঙ্গ হিসেবে বাংলাদেশে অশান্তির জন্ম, কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে হাসিনাকে উৎখাতের ডাক। জুলাই বিপ্লবের থেকে আগস্টের গণ অভ্যুত্থান। হাসিনার উৎখাত এবং ইউনূসের আগমন। নোবেলজয়ী ইউনূসও পশ্চিমা দেশেরই লোক, বিগত দশকে তিনি বাংলাদেশেও পা রাখেননি। আর শেখ হাসিনার পতনের পর আচমকা উড়ে এসে বাংলাদেশের সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেন, এটা পশ্চিমি ডিপ স্টেটেরই ইচ্ছায়। তাই তিনি চিন বা ভারতের থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলির স্বার্থ রক্ষা করবে এটাই স্বাভাবিক।
এই মুহূর্তে বেশ খানিকটা চাপে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তাঁর গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে সব ব্যাপারে খলিলুর রহমানকেই কাজে লাগাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা। এবার তিনি বোমা ফাটালেন। আচমকা সাংবাদিক সম্মেলন করে তৌহিদ হোসেন দাবি করলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করছে বাংলাদেশের এই অস্থায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেন, চিন ও পাকিস্তানকে নিয়ে ভারত-বিরোধী কোনও জোট বাংলাদেশ করছে না। তবে ভারতের তরফে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তখনই বাণিজ্য ও অন্যান্য সম্পর্ক তৈরি করা হবে, যখন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে ঢাকা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সয়াল বলেছেন, অনুকূল পরিবেশে বাংলাদেশের সঙ্গে সব বিষয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী নয়া দিল্লি।
সাম্প্রতিক দুটি খবর, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি নাড়িয়ে দিতে পারে। একটি হল, চিনের বদলে বাংলাদেশ এখন ব্রিটেন থেকে এয়ার ডিফেন্স কেনার তোড়জোড় করছে। আর দ্বিতীয়টা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য ইউনূসের বাংলাদেশ এবার অনেক বেশি দামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম ও বিমান কেনার চিন্তাভাবনা করছে। পাশাপাশি তুরস্কের মতো দেশের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে বাংলাদেশে অস্ত্র কারখানাও খুলতে উদ্যোগী ইউনূসের বাংলাদেশ। সূত্রের খবর, ভারতের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই বাংলাদেশ নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য লন্ডনে একটি সিনিয়র সামরিক প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে ঢাকা। ইকোনমিক টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের একটি উচ্চ পর্যায়ের সামরিক প্রতিনিধিদল ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত ১৯তম পূর্ণাঙ্গ বিমান প্রতিরক্ষা শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে লন্ডনে রয়েছেন। যার নেতৃত্বে রয়েছেন ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং মেজর জেনারেল মহম্মদ কামরুল হাসান। যিনি আবার বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর হিসেবে পরিচিত। জানা যাচ্ছে, ব্রিটিশ চলমান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্কাই সাবেরের ওপর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে বাংলাদেশের। ২০২১ সালে কমিশন হওয়া স্কাই সাবেরের মূল্য প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। প্রসঙ্গত. চলতি মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের চিন সফরে যাওয়ার কথা ছিল সামরিক সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্র কেনার জন্য। কিন্তু সেই সফর বাতিল হয়েছে। এরমধ্যেই খবর এল ব্রিটেন থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা কিনতে চায় বাংলাদেশ। যা চিনের প্রতি একটা বড় ধাক্কা হিসেবেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে নতুন কৌশল অবলম্বন করছে মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো জানিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্তত দু’টি পণ্য বেশি দামে কেনার পরিকল্পনা করেছে ঢাকা। বৃহস্পতিবার ঢাকার সচিবালয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্যসচিব মাসুদুল হাসানের নেতৃত্বে আয়োজিত বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, শুল্ক কমানোর আশায় গম এবং বিমান স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি দামে ট্রাম্পের দেশ থেকে কিনতে পারে বাংলাদেশ। আমেরিকার সঙ্গে সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে তিন লক্ষ টন গম আমদানি করা হবে। সাধারণত যে দামে অন্য জায়গা থেকে গম কেনা হয়, তার চেয়ে বেশি দাম দেওয়া হবে আমেরিকাকে। এর জন্য বাংলাদেশকে প্রতি টনে ২০ থেকে ২৫ ডলার বেশি খরচ করতে হবে। এতদিন রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম কিনতো ঢাকা। এবার সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে গম আসবে বাংলাদেশে। ফলে পরিবহন খরচও অনেকটা বাড়বে। একই সঙ্গে মার্কিন বোয়িং সংস্থার কাছ থেকে বিমান কেনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সেগুলির জন্যও কিছুটা বেশি দাম দিতে রাজি মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। পাশাপাশি আমেরিকা থেকে তুলো আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে ঢাকা।












Discussion about this post