ঘটা করে গত বছরের জুলাই-অগস্টের অভ্যুত্থানকে স্মরণ করতে চলতি জুলাই মাসে নানা কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশের অন্তর্বতীকালীন সরকার। সেই সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলিও শুরু করেছে উৎসবের পালন। কিন্তু এই আনন্দের আবহেও একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে, সেটা হল বাংলাদেশে আর কত অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করতে হবে হিন্দুদের? এই ভাবনাচিন্তার মূলে পুরান ঢাকার মিটপোর্ট হাসপাতালের সামনে একটি পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। আবারও ওপার বাংলায় প্রকাশ্যে দিবালোকে খুন এক হিন্দু ব্যবসায়ী। হত্যার পর তাঁর মৃতদেহের উপরে উঠে নাচল দুষ্কৃতিরা। ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল সেই ঘৃণ্য ও নৃশংশ হত্যার ভিডিও। শুধুমাত্র চাঁদা দিতে না চাওয়ায় লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ নামে ওই হিন্দু ব্যবসায়ীকে ইট, পাথর দিয়ে থেঁতলে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। তারপর থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে বিতর্ক ঘনিয়েছে। এই খুনের ঘটনায় আঙুল উঠেছে বিএনপির যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীদের দিকে। এই অভিযোগ করছে, এনসিপি ও জামাতের মতো দলগুলি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিএনপি কি লন্ডনের বৈঠকের পরই বাংলাদেশে শক্তি প্রদর্শন করতে শুরু করল, নাকি এর পিছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে এনসিপি বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ অবশ্য দাবি করছেন, এবার মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার মাইনাস-টু নীতি নিয়ে চলতে শুরু করেছে। অর্থাৎ, আওয়ামী লীগকে তাঁরা বাংলাদেশ থেকে আপাতত পুরোপুরি বিতারিত করেছে। এবারের লক্ষ্য বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি। তাহলেই জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এবং জামাতের মতো অন্যান্য ইসলামিক শক্তিগুলির পক্ষে বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল সহজ হবে। বাংলাদেশের সংবিধান বদলে দিতে, হিন্দুদের উৎখাত করতে সুবিধা হবে। সুত্রের খবর, প্রয়াত লালচাঁদের বোনের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই একটি মামলা রুজু হয়েছে ঢাকার আদালতে। গত বুধবার ব্যস্ত সড়কেই আক্রান্ত হন লালচাঁদ। প্রথমে মারধর করা এবং পরে ইট মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। থেঁতলে দেওয়া হয় শরীরের নানা অংশ। খুলে দেওয়া হয় পোশাকও। এমনকী তাঁর শরীরের উপরে উঠে কোনও অভিযুক্তকে নাচতেও দেখা গিয়েছে একাধিক ভাইরাল ভিডিওতে। বাংলাদেশের আইন উপদেষ্টা এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, মিটফোর্ডের নারকীয় হত্যাকান্ডের দ্রুত বিচারে সরকার বদ্ধপরিকর। এই ঘটনার সাথে জড়িত ৫ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। এই পাশবিক হত্যাকান্ডের দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২ এর ধারা ১০ এর অধীনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের ব্যবস্থা করা হবে।
আইন উপদেষ্টা যাই বলুক না কেন, বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই জঙ্গলরাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কেন খুন হতে হল লালচাঁদকে? যে কিনা একসময় বিএনপির যুবদলের সদস্য ছিলেন বলেই দাবি। কিন্তু তাঁর প্রাক্তন দলীয় সদস্যদের হাতেই তাঁকে খুন হতে হল বলে দাবি। ইতিমধ্যে পাঁচ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কুড়িজন অজ্ঞাতপরিচয়ের নামও যুক্ত করা হয়েছে মামলায়। জানা যাচ্ছে বিএনপির যুবদল থেকে ২ জন এবং ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে ২ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁদের নাম অভিযোগপত্রে রয়েছে। আসলে ওই ব্যবসায়ীকে হত্যার পরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের চালচিত্রটি বদলে গিয়েছে। ফুটে উঠছে পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাসের পরিবেশ। হত্যাকাণ্ডের দায় বিএনপি-র উপরে চাপিয়ে দেশ জুড়ে মিছিল করে বলা হচ্ছে, আওয়ামি লিগের পরে এ বার বিএনপি উচ্ছেদের পালা। আর এই ইঙ্গিত দিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারাই। প্রকাশ্যেই মুণ্ডপাত চলছে বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমানের। যদিও এ বার রাজনৈতিক মহলের একাংশ থেকে দেশে সেনাশাসনের দাবি উঠেছে। পথেঘাটে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্য করে আইনশৃঙ্খলার এই অবনতিতে দেশে সেনাশাসনের দাবি তুলছেন বাংলাদেশের বহু সাধারণ মানুষ। হুসেইন মহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ যেমন বর্তমান অরাজক পরিস্থিতির জন্য ইউনূস সরকারকে তুলোধোনা করে বলেছে, ‘দেশবাসী সেনাবাহিনীর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। অনেক হয়েছে, মানুষ চাইছেন এই সরকারকে বিদায় করে সেনাবাহিনী প্রশাসনের দায়িত্ব নিক। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগিরের মন্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ফখরুল বলেন, ‘নতুন করে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। লালচাঁদ সোহাগের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কোনও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার হচ্ছে কি না।
যদিও পুরান ঢাকার মিটপোর্ট হাসপাতালের সামনে ওই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে সেনাবাহিনীও। তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার যেমন চেষ্টা করেছে। তেমনই জগগণকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীকে অ্যাকশনে দেখা যাচ্ছে। তবুও এই ধরণের হত্যাকাণ্ড অনেক প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্ব নিয়ে।











Discussion about this post