ঘটনাচক্র যেন ঘুরে ফিরে এক জায়গায় ফিরে আসে। এটাই যেন ভবিতব্য। বাংলাদেশের ঘটনাও ঠিক তাই। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকালে। সেবার বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপি-সহ সমমনা দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছিল। সেবার তাঁদের দাবি ছিল একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনা করা। সেবারও বড় সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না আসায় দু:খ বা হতাশা প্রকাশ করে সেই নির্বাচনে হওয়া অনিয়মগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহবান জানিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সেবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এককভাবেই ২২২ আসনে জয়লাভ করেছিল। বাংলাদেশের এক নির্বাচন নিয়ে এত বিতর্ক এবং এত আন্দোলন, দুই বছরের মাথায় পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে একই বিতর্ক। তবে অভিযোগের তির উল্টে গিয়েছে।
২০২৪ সালের জুন জুলাই মাস থেকেই মাস থেকেই বাংলাদেশ শুরু হয়েছিল কোটাবিরোধী আন্দোলন। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বান ছিল বাংলাদেশে বৈষম্য দূর করা। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয় এবং আগস্টের ৫ তারিখ বাংলাদেশে এক গণঅভ্যুত্থানে সেই শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কি বৈষম্য দূর হল? ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়দশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বলে এখনও পর্যন্ত খবর। এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে দূরে সরিয়েই করতে চলেছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেইসঙ্গে শেখ হাসিনার দলের সহযোগী কয়েকটি দলকেও দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আছে। তাহলে কি দাঁড়ালো? এবারও নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না, যে দাবিটা ছিল ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন কি করছে, পশ্চিমা বিশ্বই বা কি করছে? ওয়াকিবহাল মহলের মতে সবকিছুই ঠিক করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে দ্বাদশ নির্বাচনের আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর-সহ দলটির বহু নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছিল। এমনকি বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা-সহ অনেক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ফলে রাজনৈতিক নানা ঘটনাপ্রবাহের মাঝে দ্বাদশ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র মতবিরোধের মধ্যেই অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষকদল পাঠায়নি ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এবার তাঁরা কি করবে? সেবার রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে বিএনপি-সহ একাধিক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণই করেনি। কিন্তু ছাব্বিশের ত্রয়োদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ইচ্ছাকৃতভাবেই বাইরে রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ মানুষকে তাঁদের পছন্দের দলকে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেত্রী যদিও বলেছেন, নো বোট, নো ভোট। অর্থাৎ, যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতীক থাকবে না, সেখানে যেন সমর্থকরা ভোট না দেন। এই পরিস্থিতিতে দুটো সম্ভাবনা তৈরি হয়, একটা হল বেশিরভাগ আওয়ামী সমর্থক ভোট না দিলে ভোটিং পার্সেন্টেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এটা আন্তর্জাতিক মহলে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হবে আওয়ামী লীগের জন্য। আর দ্বিতীয়টা হল, আওয়ামী সমর্থকরা দলীয় নির্দেশ না মেনে ভোট দিলেন, তাহলে কে বা কারা সেই ভোট পাবেন? সবমিলিয়ে এটাই নিশ্চিত হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোট হলেও আওয়ামী সভ্য সমর্থকরাই ত্রয়োদশ নির্বাচনে নির্নায়ক ভুমিকায় থাকবেন।
এখানে উল্লেথ করা যেতে পারে, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস রবিবার এক সাংবাদিক বৈঠক করে বলেন, বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিগত তিনটি নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা্ংলাদেশে পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। এবার তাঁরা পাঠিয়েছে। সেই পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস রবিবার জানিয়েছেন, আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশের সব সামাজিক দলের অন্তর্ভুক্তি, যেমন নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আঞ্চলিক দল। অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা বুঝিয়েছি, বিশ্বাসযোগ্য ভোটারের উপস্থিতি। এটি এ বার্তা দেবে যে বাংলাদেশি নাগরিকেরা নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করছে।
ইইউ জানিয়েছে, নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর তাঁরা তাঁদের পর্যবেক্ষণ জানাবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, যা আগের তিনটি নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাতে নারাজ ছিল অগণতান্ত্রিক নির্বাচনের ধুঁয়ো তুলে। তাঁরাই এখন কেন এত উতলা আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন নিয়ে। ইউরিপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় আসন্ন নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে বলেও মন্তব্য করতে পিছপা নয়। এটাই কি দ্বিচারিতা নয়? প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের অন্দরেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান পর্যবেক্ষকের কথায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলতে জানিয়েছেন, আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশের সব সামাজিক দলের অন্তর্ভুক্তি, যেমন নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আঞ্চলিক দল। অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা বুঝিয়েছি, বিশ্বাসযোগ্য ভোটারের উপস্থিতি। কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থকরা যদি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করেন, তাহলে কি হবে? এ ব্যাপারে ইইউ জোটের বক্তব্য, যা বলার ১৪ ফেব্রুয়ারি বলবো। অর্থাৎ, ভোটের পার্সেন্টেজ দেখেই বলবেন তাঁরা।












Discussion about this post