বেশ কয়েকদিন ধরেই বাংলাদেশের একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্লেষকরা বলে আসছেন, সামনে কঠিন সময় আসছে। এবার মনে করা হচ্ছে, সেই কঠিন সময় এসেই গেল। ১৩ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে একটি গুরূত্বপূর্ণ মামলার রায় ঘোষণার তারিখ জানানো হবে। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী গণহত্যার মামলার রায় দেওয়ার কথা ট্রাইবুনালের। যদিও বাংলাদেশের প্রাক্তন আইজিপি এই মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে গিয়েছেন। তাই তাঁর শাস্তি কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাকি দুজনের যে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে এটা বাংলাদেশের বাচ্চারাও জানেন। ফলে আওয়ামী লীগও ছেড়ে দেওয়ার মতো দল নয়। তাঁরাও আগেভাগে রীতিমতো একাধিক কর্মসূচি ঘোষণা করে দিয়েছেন ১৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে। যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিষিদ্ধ করে রেখেছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সেই আওয়ামী লীগই এখন তেড়েফুঁড়ে নেমে পড়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আঙ্গিনায়। যারা বিগত কয়েকমাস ঝটিকা মিছিল করেই ক্ষান্ত হতেন, তাঁরা আজ ঘোষণা দিয়ে কর্মসূচি পালন করছে। এটাই রাজনৈতিক মহলের কৌতুহলের বিষয়। তাহলে কি এবার পুরোপুরি খেলা শুরু করে দিল শেখ হাসিনার দল?
গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পরে এই প্রথম বড়সড় রাজনৈতিক ঝড়ের মুখোমুখি হতে চলেছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। তবে শুধু সরকারই নয়, একই ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইউনূসের সমর্থক এবং আওয়ামী বিরোধী জামায়াতে ইসলামি, এনসিপি এবং বিএনপির মতো রাজনৈতিক শক্তিগুলিও। ১০ থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত তিন দিন প্রতিবাদ আন্দোলন, মিছিল, সভা প্রায় করেই ফেলেছে আওয়ামী লীগ। এবার ১৩ নভেম্বর লকডাউন কর্মসূচি সফল করলেই কেল্লাফতে। এক বড়সড় অনিশ্চিয়তার মুখে আওয়ামী লীগ ফেলে দিতে পারবে জামাত, বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলিকে। প্রথম তিনদিনের কর্মসূচির সফলতা আঁচ করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী নেত্রী তথা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন আহ্বান জানালেন। তিনি বললেন, ‘যে যেখানে আছো, যার যা কিছু আছে তা নিয়ে সব তৈরি হও। মাঠে নামতে হবে। ১৩ তারিখ ঢাকা অবরুদ্ধ করতে হবে। সবাই মিলে এই কর্মসূচি সফল করতে হবে’। কেবলমাত্র এই লকডাউন কর্মসূচির জন্যই ভার্চুয়াল মাধ্যমে আলাদা করে একাধিকবার ভাষণ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। কি করতে হবে, কি করা যাবে না সেই সমস্ত ভাষণে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন দলীয় কর্মীদের। অন্যদিকে তিনি এবং তাঁর দলের নেতৃত্ব পাখি পড়ার মতো করে বলে চলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের এই বিচার বেআইনি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যেন বিভ্রান্ত না হন সেটাই লক্ষ্য আওয়ামী লীগের। শেখ হাসিনা-সহ আওয়ামী লিগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওই ট্রাইবুনালে বিচার হতে পারে না বলে নানা যুক্তিও সাজিয়েছেন নেতা-কর্মীরা। প্রসঙ্গত ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইন প্রণয়ন করেছিল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শক্তি জামাত-ইসলামি এবং তাদের সহযোগী রাজাকার, আল বদর ও আল সামসের নেতাকর্মীদের বিচারের জন্য। হাসিনার আমলেও ওই ট্রাইবুনালে কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিচার চলছিল। কিন্তু ইউনূস এসেই তা পাল্টে দিয়েছেন। এই সরকার রীতিমতো অর্ডিন্যান্স জারি করে ট্রাইবুনালের শেখ হাসিনা সহ বিগত সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বিচারের ব্যবস্থা করেছে। ইউনুস সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে নালিশও জানিয়েছে আওয়ামী লীগ।
এবার আসা যাক লকডাউন প্রসঙ্গে। গত দশ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা উপজেলায় আওয়ামী লীগ যেভাবে মিটিং মিছিল সংগঠিত করেছে তাতে রাতের ঘুম উড়েছে ইউনূসের। ভয় এতটাই যে সেনাবাহিনীর অর্ধেক জওয়ানকে ব্যারাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলেও এবার আবার তাঁদের মাঠে ফেরানো হচ্ছে। গত ৪-৫ দিন ধরে ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলায় লাগাতার ধরপাকড় চলছে। কিন্তু এতকিছুর পরও দমছে না আওয়ামী লীগ। জেলায় জেলায় উপজেলায় যেভাবে মিছিল ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছে হাসিনার দল তাতেই চোখ কপালে উঠেছে ইউনূস প্রশাসনের। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী লিগ তাদের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে। আর এই কারণেই শেখ হাসিনার দলের বাংলাদেশের মাটিতে মিটিং মিছিল কর্মসূচি অনেকটাই সফল হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে আওয়ামী লীগ প্রত্যাঘাত করার জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। তাঁরা ১৩ নভেম্বর লকডাউন নিয়েও আলাপ আলোচনা করছেন। বিষয়টি টের পেয়েই বিশাল আয়োজন করছে অন্তর্বর্তী সরকার। যেমন কোনও ধরনের সন্ত্রাস সহ্য করা হবে না জানিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী। তিনি জানান, লকডাউন ঘিরে পেট্রলিং বাড়ানো হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারের কার্যক্রম অব্যাহত আছে। রাস্তার ধারে পেট্রল বেচা যাবে না। এগুলো দিয়ে অঘটন ঘটানো যায়। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ খেলা শুরু করে দিয়েছে, আর তাতেই ডিফেন্সিভ মোডে চলে গিয়েছে ইউনূসের সরকার।












Discussion about this post