ভোটের ফলপ্রকাশের পরেই ‘মানবিক’ বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পরে বুধবার জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে তারেকের প্রতিশ্রুতি, ‘দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান তথা দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্য এই দেশকে একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করা এবং একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।শেখ হাসিনা গদিচ্যুত হওয়ার পরে গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের জমানায় বারবার সংখ্যালঘু নির্যাতন, হিংসা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্নের মুখে পড়েছিল ইউনূস প্রশাসন। নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের টানাপড়েনের মূলেও অন্যতম কারণ ছিল এটিই। তাই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে এ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিলেন তারেক, এমনটাই মত কূটনৈতিক মহলের অনেকের।আইনের শাসন, দুর্নীতি রোধ এবং ব্যয়সঙ্কোচ- প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে জাতির উদ্দেশে ভাষণে এই তিন বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তারেক। মঙ্গলবার বিকেলে সংসদের সাউথ প্লাজ়ায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তাঁর বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা বেগম খালেদা জিয়া দু’জনেই ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। ভাষণে তারেক বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের সময়ের দুর্নীতি ও দুঃশাসনে বিপর্যস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্বল শাসন কাঠামোর মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। তাই জনমনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোর ভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকেইূ প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’ বিশেষ করে জুয়া ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।মুসলিম সমাজের পবিত্র মাস রমজান উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা সতর্ক থাকবেন। অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে বিএনপি সরকার বদ্ধপরিকর।’ প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে সরকারি ব্যয়সঙ্কোচের উপরেও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, বিএনপির সংসদীয় দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, দলের কোনও এমপি সরকারি সুবিধায় ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট বণ্টনে কোনও সুবিধা নেবেন না।এ দিনই বিএনপি-র মিডিয়া সেল থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় মিতব্যয়িতা, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারেক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি সরকারি কোনও গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার করবেন না। এমনকী, গাড়ির চালকও হবেন তাঁর নিজস্ব ও ব্যক্তিগত। বুধবার গুলশনের বাড়ি থেকে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ, শেরে বাংলা নগর তাঁর বাবা-মায়ের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানো এবং সচিবালয়ে যাওয়ার পথে তিনি এই ব্যক্তিগত গাড়িটিই ব্যবহার করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, শহরের তীব্র যানজট এবং ভিআইপি চলাচলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রোটোকল বা গাড়িবহরের সংখ্যা অর্ধেকের চেয়েও বেশি কমিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় রাস্তার দু’পাশে দীর্ঘক্ষণ উর্দিধারী পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকার রীতিও তিনি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান অথবা বিদেশি অতিথিদের সফর ছাড়া দৈনন্দিন চলাচলের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তাঁর গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবেন না বলে জানানো হয়েছে।গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে করা মন্তব্যের সূত্র ধরে তারেক বলেন, ‘আমি বলেছিলাম ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। আপনারা ভোট দিয়ে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছেন। এখন সব অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের।’গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা নৈরাজ্যের বাংলাদেশে ফিরেছে শান্তির পরিবেশ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক সরকার। বিপুল ভোটে জয়লাভ করে ক্ষমতা দখল করেছে বিএনপি। নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারেক রহমান।ক্ষমতায় এসেছে প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দল বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন খালেদা পুত্র তারেক রহমান।আর বুধবার ছিলো তারেকের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক। আর প্রথম বৈঠকেই বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে দিলেন বড় বার্তা। মন্ত্রিসভার বৈঠকের প্রথম ভাষণেই তারেক জানান, দেশে যে কোনও ধরনের অনাচার সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন তিনি। কোনওরকম সিন্ডিকেট, ভাঁওতাবাজি বরদাস্ত করা হবে না। একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের উদ্দেশেও দিয়েছেন অভয় বার্তা।একই সঙ্গে দেশে সিন্ডিকেটরাজ নিয়েও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বলেন যে, ”হাজার হাজার প্রাণের বিনিময়ে আমরা গণতন্ত্রের সরকার প্রতিষ্ঠা করেছি। মাফিয়া-সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা সরকার প্রতিষ্ঠা করেছি। সুশৃঙ্খলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছি। এই মহান কাজে যাতে কোনওরকম বাধা বিঘ্ন না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখা আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য। বিএনপি সরকার দেশের সবক্ষেত্রে অনাচার, অবিচার, সিন্ডিকেট রাজত্ব ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর।’
শুধু দেশের উন্নয়ন, সিন্ডিকেট ব্যবস্থার ধ্বংস নয়। বাংলাদেশে এতদিন ধরে যেভাবে সংখ্যালঘু হিন্দুরা আক্রান্ত হয়েছেন। খুন হয়েছেন তার বিরুদ্ধেও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘পাহাড় থেকে সমতল বাংলাদেশ সবার জন্য। এখানে মুসলিম-হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সকলে মিলেমিশে বাস করবে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সবাই একজোট হয়ে এগিয়ে আসবে।’
সকলের জন্য তিনি বাংলাদেশকে নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চান বলেও আশা প্রকাশ করেছেন সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি নেতা তারেক রহমান। এখন দেখার বিষয় তারেকের এই নীতি ভারত কতটা পূর্বের বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় তারেকের নয়া বাংলাদেশের দিকে।












Discussion about this post