গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের অবস্থান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের সামরিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে – বাংলাদেশ কি সত্যিই কোনওভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে? জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান কেন এমন কথা দিয়ে এলেন ট্রাম্প প্রশাসনকে। না কি এটি কূটনৈতিক চাপ ও ভূ-রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ফল?
ইউনুস জমানায় ইজরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নামে বাটার শোরুমে তাণ্ডব চালিয়েছিল কট্টরপন্থী বাংলাদেশিরা। কোকাকোলা এবং আরও অনেক সংস্থার কোল্ডড্রিঙ্কসের বোতল রাস্তায় নষ্ট করা হয়েছিল। কারণ, এই সব সংস্থা নাকি ইহুদিদের। প্যালেস্তাইনের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে যে বাংলাদেশিরা নিজেদের দেশেই তাণ্ডব চালিয়েছিল, সেই বাংলাদেশই এবার গাজায় সেনা পাঠাতে চাইছে। এই নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে নাকি কথাও হয়েছে ইউনুস সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজায় আন্তর্জাতিক শান্তি বাহিনী মোতায়েন করা হবে। এই আবহে ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে খলিলুর রহমান মার্কিন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, গাজায় সেনা পাঠাতে চায় বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, ইজরায়েলকে সাহায্য করতে এবং হামাসকে শেষ করতেই এই আন্তর্জাতিক সামরিক জোটকে গাজায় পাঠানোর পরিকল্পনা আমেরিকার। পাকিস্তানও এই জোটে অংশ নিয়ে গাজায় সেনা মোতায়েন করবে। আর যে বাংলাদেশ ইজরায়েলকে স্বীকৃতিই দেয় না, তারাও এখানে বাহিনী পাঠাতে চাইছে।
গত ৯ জানুয়ারি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয় খলিলুরের। সেই বৈঠকের পর বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বিবৃতিতে বলে, গাজায় আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি উত্থাপন করেন খলিলুর রহমান। তাতে মার্কিন কর্মকর্তারা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেন। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ভিসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের ওপর ‘বন্ড শর্ত’ আরোপ করেছে আমেরিকা। এরই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির জন্যেই বাংলাদেশ গাজায় সেনা পাঠাতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর আগে ইউনুস জমানায় মার্কিন সেনার হাতে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ তুলে দেওয়ার বিষয়ে অনেক গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। এমনকি কক্সবাজার থেকে রাখাইন প্রদেশে করিডোর নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশে মার্কিন সেনার উপস্থিতি সেই সব জল্পনা আরও উস্কে দিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার আরও ঘনিষ্ঠ হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ইউনুস। গাজায় সেনা পাঠানোর প্রস্তাব তারই প্রমাণ।
শনিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গতকাল শনিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন রাজনৈতিকবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যালিসন হুকার এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এই প্রস্তাব দেন। আন্ডার সেক্রেটারি হুকার বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে মিলে কাজ করতে ইচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্র। গত বছরের নভেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের অবসানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ২০ দফা পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়ে একটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব পাস করে। এই পরিকল্পনার ধারাগুলোর মধ্যে একটি ছিল গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির নিরাপত্তা এবং তত্ত্বাবধানের জন্য একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) গঠন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের হামলার এ পর্যন্ত ৪০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার ২০ লাখেরও বেশি মানুষ এখন ক্ষতিগ্রস্ত ভবন বা অস্থায়ী তাঁবুতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সংকীর্ণ এই ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনারা সরে যাওয়ার পর সেখানে হামাস ফের তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপের কঠিন শর্তগুলো নিয়ে ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। ২০২৩ সালের শেষের দিক থেকে গাজায় নির্বিচারে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ সংঘাতের ফলে সেখানে চরম খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে গাজার পুরো জনগোষ্ঠী।












Discussion about this post