১৭ নভেম্বর দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে আরও একটা কারণে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। আজ থেকে ৫৮ বছর আগে এই দিনে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী এম এ ওয়াজেদ আলির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন মুজিব কন্যা। আর সেই তারিখেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাঁকে মৃত্যদণ্ডের সাজা দিয়েছে। সাউথ ব্লক নিশ্চিত ছিল, রায় ঘোষণার পরে পরেই ঢাকা হাসিনাকে ফেরত চাইবে। আর হয়েছে ঠিক তাই। ঢাকার রাজনৈতিকমহল মনে করছে ট্রাইব্যুনালে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে হাসিনাকে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই। যদিও তিনি সেই পথে হাঁটবেন না বলেই মনে করছে দুই দেশের কূটনৈতিক মহল।
শুধু হাসিনা নয়, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সে দেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও যাতে ‘অবিলম্বে প্রত্যর্পণ’ করা হয়, সরকারি ভাবে নয়াদিল্লির কাছে আর্জি জানাল ঢাকা। তদারকি সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল রায় ঘোষণার পরে পরে জানান, হাসিনাকে ফেরত চেয়ে শিগগিরই ভারতে ফের চিঠি দেবেন তাঁরা। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামের হুঙ্কার — ‘শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে এক মাসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে।’ কিন্তু ভারত কি হাসিনাকে ফেরাতে বাধ্য? বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রক অবশ্য জোরের সঙ্গে দাবি করে জানিয়েছ, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ক্ষমতাচ্যূত প্রধানমন্ত্রীকে ঢাকায় প্রত্যর্পণ ‘ভারতের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য’। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, হাসিনা-আসাদুজ্জামানকে আশ্রয় দেওয়াটা অত্যন্ত অবন্ধুসুলভ আচরণ হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য হাসিনা এবং তাঁর প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান পাবেন এক মাস। তবে ০২১৩ সালে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে রাজনৈতিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত কোনও ব্যক্তির প্রত্যর্পণ আবেদন খারিজ করার অধিকার দুই দেশের রয়েছে। ভারত সেই পথেই হাঁটবে বলে মনে করছে কূটনৈতিকমহল। সোমবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফ থেকে বিবৃতি জারি করে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা ভারতের নজরে রয়েছে। ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে, বাংলাদেশের জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত। একইসঙ্গে নয়াদিল্লি চায়, শান্তি, গণতন্ত্র এবং স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক বাংলাদেশে।’ সেই লক্ষ্যে নয়াদিল্লি সব পক্ষের সঙ্গে সুষ্ঠু ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে বলেও জানিয়েছে ভারত সরকার। সূত্রের দাবি, দিল্লিতে হাসিনার সেফ হাউসের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রির দেওয়া গত অক্টোবরের বিবৃতি এখানে উল্লেখ করতে হয়। ভারতের বিদেশ সচিব বলেছিলেন, ‘প্রত্যর্পণের সঙ্গে নানা বিধ আইনি বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। সে জন্য দুদেশের মধ্যে আলোচনার প্রয়োজন। ’ ওয়াকিবহল মহলের মতে, বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি এই অজুহাতে হাসিনার প্রত্যর্পণ আটকাতে পারে দিল্লি। আবার ঢাকার প্রত্যর্পণ আর্জি পুরোপুরি খারিজ করাটাও নয়াদিল্লির পক্ষে সহজ হবে না বলে মত একাংশের।
ঢাকার চিঠি দিল্লির হাতে পৌঁছানোর পর ভারতের কী পদক্ষেপ হবে, তা নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে জোর তর্জা। কারণ হাসিনার পরিচয় শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়। তিনি দুই দেশের সম্পর্কের এক সৃজনশীল কারিগর। তাঁর প্রত্যর্পণ বা প্রত্যাখ্যান দুটি সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে কি তা হলে এ বারও জল মাপার পন্থা নিচ্ছে নয়াদিল্লি? নামপ্রকাশে অনিচ্ছিুক দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আন্তর্জাতির সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ যদিও বলেন, ‘ভারত কিছুই করবে না। বিদেশ মন্ত্রকের জারি করা বিবৃতিই তার প্রমাণ।’












Discussion about this post