তাঁর অঙ্গসজ্জার ‘অভিজ্ঞান’ ছিল একখানা ঢাউশ রোদচশমা। দিনে সেই চশমা ছাড়া কখনও তাঁকে দেখা গিয়েছে, সেটা কেউ স্মরণ করতে পারছেন না। সূর্যাস্তের পর যার জায়গা নিত একটা মোটা ফ্রেমের চশমা। স্থিরদৃষ্টিতে সেই চশমার পিছন থেকে তাকিয়ে কথা বলতেন তিনি। গলার স্বর ছিল ঈষৎ ব্যারিটোন। থেমে থেমে, কাটা কাটা বাক্যে নিজের মনোভাব বোঝাতে পারঙ্গম খালেদার তখন থেকেই ‘পুতুল’ থেকে ‘বেগম জিয়া’য় রূপান্তরের সূত্রপাত। দীর্ঘ লডা়ইয়ের পর মঙ্গলবার ঘটল জীবন থেকে ছুটি। এ ছুটি রাজনীতির লড়াই থেকে, এই ছুটি রোগভোগের জীবন থেকে। সাক্ষী রইল একটা লাল টেলিফোন। সেই টেলিফোনের রিসিভার ধরার হাতটি মঙ্গলবার ভোরে চিরকালের জন্য ছেড়ে দিল। সেই সঙ্গে ঘটল একটি বর্ণময় জীবনের পূর্ণচ্ছেদ।
অবশ্য যতিচিহ্ন অনেকদিন আগেই পড়ে গিয়েছিল। সেটা ২০২৪-য়ের ঘটনা। গত বছর জুলাই-অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছিল হাসিনাকে। আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গেলেন লোকান্তরী। জীবদ্দশায় যিনি হয়ে উঠেছিলে লার্জার দ্যান লাইফ। হাসিনার পরিচয় তিনি মুজিব কন্যা। আর তাঁর পরিচয় তিনি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর অবশ্য নিজের পরিচয় তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী তো তিনি।
তাঁর মৃত্যু মিলিয়ে দিল রাজনীতিতে তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে। তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন প্রয়াত নেত্রীর ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অবদানের’ কথা। তিনি হাসিনা। জিয়া-পুত্র এবং পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা লিখেছেন, “বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর (খালেদা) অবদান অপররিসীম। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি হল। আমি বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। ”
শেষ কয়েকদশক ধরে পদ্মাপারের জাতীয় রাজনীতিতে ঘুরে ফিরে এসেছে হাসিনা ও জিয়ার নাম। রাজনীতির আঙিনা ছাপিয়ে তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কখন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাঁদের ব্যক্তিগত পরিসরেও ঢুকে পড়ে। উঠে এসেছিল একটি লাল টেলিফোনের কথা। দুই নেত্রীর কথোপকথনের একাংশ একবার প্রকাশ্যে চলে আসে। ফোনটি খারাপ হয়ে গিয়েছিল, না কি সেটি ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ ধরা হয়নি, তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে বাদানুবাদ চালিয়ে গিয়েছেন দুই। মোবাইলের যুগে সেই লাল ফোন এখন সচল আছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক কিন্তু আজও রয়ে গিয়েছে। তবে টেলিফোনের অপরপ্রান্তে রিসিভার যিনি ধরে রেখেছিলেন, তিনি চিরকালের মতো সেই রিসিভার ছেড়ে দিলেন।
বেগমের জন্ম ১৯৪৫ সালে, অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে। বাবা ইসকন্দর আলি মজুমদারের চায়ের ব্যবসা ছিল। ব্যবসার কথা চিন্তা করেই দেশভাগের সময় সপরিবার দিনাজপুর শহরে (অধুনা বাংলাদেশে) চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। খালেদাদের আদি বাড়ি অবশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। অধুনা বাংলাদেশের ফেনি জেলার ফুলগাজিতে। আর মাতৃকুলের সাকিন চাঁদবাড়ি (অধুনা এ পারের উত্তর দিনাজপুরে)। ১৯৬০ সালে পাক সেনার তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদার বিয়ে হয়। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল খালেদা খনম পুতুল। বিয়ের পরে অবশ্য স্বামীর নামের প্রথম দুই অক্ষরকেই পদবি হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন তিনি। নতুন নাম হয় খালেদা জিয়া। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাক সেনা আধিকারিক জিয়াউরের পাশে থাকতে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও গিয়েছিলেন খালেদা। বাংলাদেশে ফিরে থাকতে শুরু করেন চট্টগ্রামে।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ছ’বছর পরে, ১৯৭৭ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন স্বামী জিয়াউর। তার পরের বছর ‘দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ’ করতে তৈরি করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি)। জিয়াউর প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পদাধিকার বলে ‘ফার্স্ট লেডি’ হন তাঁর পত্নী খালেদা। সেই প্রথম আপাত অন্তর্মুখী স্বভাবের পুতুল জনসমক্ষে আসেন। তখনও অবশ্য রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল না তাঁর। তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর সেনা আধিকারিকদের গুলিতে খুন হওয়ার পর মত বদলান খালেদা। সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮২ সালে স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি-র সাধারণ সদস্যপদ গ্রহণ করেন। দলের সহ-সভাপতি হন ১৯৮৩ সালে।
নেতৃত্বে এসেই সরাসরি শুরু হয় সংগ্রাম। হুসেন মহম্মদ এরশাদের সেনা শাসনের বিরুদ্ধে তিনি দলকে লড়াইয়ে নামিয়ে দেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই জোরদার করতে আরও ছ’টি দলের সঙ্গে জোট গঠন করে বিএনপি। ১৯৮৪ সালে দলের শীর্ষপদে আসীন হন জিয়া। বিএনপিতে শুরু হয় বেগম অধ্যায়। দু’বছর বাদে এরশাদের শাসনাধীনে বাংলাদেশে নির্বাচন হয়। প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পরে তারা মত পরিবর্তন করে। কিন্তু খালেদার দল সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। ১৯৯০ সালে গণবিক্ষোভের মুখে পড়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এরশাদ।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯০। সংখ্যার হিসেবে মাত্র চার বছর। এই চার বছরে বহুবার তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়। কিন্তু এরশাদ বিরোধী লড়াই থেকে একবারের জন্য বেগম সরে আসেননি। সেই লড়াই মিডিয়ার সব আলো শুষে নিয়েছিল। আর তিনি আক্ষরিক অর্থে হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মুখপাত্র। ১৯৯১ তে জনজোয়াড়ে ভেসে ক্ষমতায় এসেছিলেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। বাংলাদেশে শুরু হল বেগম পর্ব।
দু দফায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন বেগম। প্রথম দফায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত। ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে হয়েছিল নির্বাচন। সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য মসনদে আসীন হন জিয়া। কিন্তু তত্ত্বাধায়ক সরকারের নেতৃত্বে বিরোধীরা নির্বাচনের দাবি জানায়। সে দফায় জিয়ার মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন (১৯ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ)। ওই বছর জুনে হয়েছিল নির্বাচন। বাংলাদেশে ঘটল ক্ষমতার পালাবদল। নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। তৃতীয় এবং শেষবার ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বেগম জিয়া।
২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয় খালেদার। সেনা সমর্থিত তদারকি সরকারের পর্যবেক্ষণে ২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচন হয় বাংলাদেশে। সেই নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় হয় বিএনপি-র নেতৃত্বাধীন চতুর্দলীয় জোটের। খালেদার দল মাত্র ৩০টি আসন পায়। আওয়ামী লীগের মহাজোট পায় ২৬৩টি আসন। হাসিনার দলই একক ভাবে পায় ২৩০টি আসন। তার পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসর থেকে ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকেন খালেদা। ধারাবাহিক অসুস্থতাও তাঁর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পথে অন্তরায় হয়ে ওঠে।
দলের মধ্যে এখনও যারা আশাবাদী, তারা বিশ্বাস করে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে জনভিত্তি দিয়েছিলেন বেগম জিয়া। স্বামী যেটা করতে পারেননি। সেই জনভিত্তি বেগমের মৃত্যুতে টাল খাবে না বলেই তাঁরা মনে করছেন। রাজনীতি বিমুখ পুতুলের বেগম হয়ে ওঠার লড়াই বিএনপি বাকি নেতাদের অনুপ্রাণিত করবে। আর দলকে দিশা দেখাবেন জিয়া-পুত্র তারেক।












Discussion about this post