আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচন। মুহাম্মদ ইউনুস জানিয়েছেন, এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠ করতে তাঁর সরকার বদ্ধপরিকর। তিন বাহিনীর প্রধান তাদের ইউনিটের সদস্যদের জানিয়ে দিয়েছেন দেশের প্রতিটি নাগরিক যাতে তাদের মতধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে আবার ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে কেন্দ্র করে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোনও কোনও প্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে ভোট বানচাল করতে একটি গোষ্ঠী রীতিমতো সক্রিয়। তবে যা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই, তা হল এই সরকারের বিদায় আসন্ন। বিদায়লগ্নে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ করছে। যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা জল্পনা উস্কে দিচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন খাতে চুক্তি। নতুন একটি চুক্তির খবর এবার প্রকাশ্যে এল। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রকের উপদেষ্টা শেখ বশিরুদ্দিন যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং সংস্থার সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে। বলা হচ্ছে, এই চুক্তি বিমানের কোনও বোর্ড অনুমোদন বা ফিট প্ল্যানিং বা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। এমনকী বিমান বাংলাদেশের অনুমতি নেওয়া হয়নি। এই সংস্থার কাঁধেই দায়িত্ব পড়বে বিমান পরিচালনার দায়িত্ব। ফলে, প্রশ্ন উঠছে যে প্রতিষ্ঠান বাস্তবে অপারেশন করবে, সেই সংস্থার সম্মতি ছাড়াই কীভাবে এমন একটি বহু বিলিয়ন ডলারের অর্ডার প্লেস করা সম্ভব হল? তার থেকে আরও একটি গুরুতর বিষয় হল এই ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে গ্যারান্টার করা হয় রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্রকে গ্যারান্টার করার অর্থ, আর্থিক ঝুঁকি গিয়ে পড়ে সে দেশের নাগরিকের ওপর। বাংলাদেশ এমনিতেই দেনায় জর্জরিত। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার এবং বিশ্ব ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে, তারা বাংলাদেশকে আপাতত কোনও ঋণ দেবে না। যে দেশের আর্থিক অবস্থা সকরুণ, সেই দেশের সরকার কী করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে একটি আন্তর্জাতিক বিমান নির্মাণ সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে?
এয়ারক্র্যাফট কেনার অর্ডার কোনও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে বেশ কয়েকটি বিষয় যুক্ত থাকে। সেই সব বিষয়গুলি হল দীর্ঘমেয়াদি ফিট প্ল্যানিং, রুট স্ট্র্যাটেজি, যাত্রী চাহিদা, ক্যাশফ্লো, রক্ষণাবেক্ষণের পরিকাঠামো, পাইলট এবং প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ ও ঝুঁকির মূল্যায়ন। এই ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া হেঁটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত পথে। চুক্তি হয়েছে প্রথমে। তারপর শেখ বশিরুদ্দিন দেশে ফেরেন। তদারকি সরকার প্রধান তাঁকে বিমান চলাচল মন্ত্রকে উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করেন। উপদেষ্টা পদে থাকাকালীন তাঁকে বিমানের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ করা হয়। পরে এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বিমান সংস্থাকে বাধ্য করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, এই চুক্তি কি রাষ্ট্রের স্বার্থে না দেশের স্বার্থে?
এই প্রশ্ন আরও গুরুত্ব পায় যখন এর টাইমলাইন বিশ্লেষণ করা হয়। বলা হচ্ছে, বোয়িং চুক্তির সঙ্গে ট্যারিফ বা ভাড়ার কোনও নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক নেই। একই সময়ে দেশে টিকিটের দাম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাংলাদেশজুড়ে চলছে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকে লিখিতভাবে সতর্ক করে দিয়েছে। তারা বলেছে, সরকারি ভাড়া নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাজার, প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগের জন্য ক্ষতিকর। প্রশ্ন এখানেই। এত কিছুর পরেও কী কারণে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি সই করল তদারকি সরকার? আর কেনই বা নির্বাচনের মুখে এই চুক্তি সই করতে হল।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যানশিপ ও বোর্ড গঠন। দেশে ফিরে উপদেষ্টা পদে থেকেই শেখ বশিরুদ্দিন বিমানের চেয়ারম্যান হন। বর্তমানে বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সরকার পরিবর্তনের আগে বশিরুদ্দিন তাঁর ঘনিষ্ঠদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করেন। এসবের থেকেও স্পর্শকাতর বিষয় তো হল থার্ড টার্মিনাল গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং প্রসঙ্গ। এর নিয়ন্ত্রণ বিমানের কাছে থাকার কথা। কয়েকশো কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। অতচ চেয়ারম্যান হিসেবে বসেই থার্ড টার্মিনালের ক্ষেত্রে বিমানের এই সর্বোচ্চ লাভজনক সার্ভিস বাতিল করা হয়।












Discussion about this post