ইতিহাস গড়ল জামায়তে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু এবং হল সংসদ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি জিতে নিল মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা পিছনে ফেলে দিল বিএনপি এবং এনসিপির মতো প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠনগুলিকেও। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাধারণ সম্পাদক পদে ছাত্রশিবিরের প্রার্থীদের জেতাটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নয়া অধ্যায়ের সূচনা করল বলে অনেকে মনে করছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কার্যত অবাক করে দিয়ে ভিপি, জিএস, এজিএস ছাড়াও ১২টি সম্পাদক পদের নয়টিতেই জয়ী হয়েছেন ইসলামী ছাত্র শিবির সমর্থিত প্যানেল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। শুধু তিনটি সম্পাদক পদে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, ছাত্রশিবিরের নির্বাচিত প্রার্থীদের সঙ্গে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছাত্রদলের প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান অনেক। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট বা ভিপি পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের সাদিক কায়েম ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল সমর্থিত আবিদুল ইসলাম খান মাত্র ৫ হাজার ৭০৮ ভোট পেয়েছেন। অর্থাৎ জয়ের ব্যবধান ৯ হাজারেও বেশি। অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক বা জিএস পদে ১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রশিবির প্যানেলের এস এম ফরহাদ। এজিএস বা সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মহিউদ্দীন খান ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জয়ের ব্যবধান অর্ধেকের বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে আওয়ামী লিগের ক্ষমতায় না থাকার সুযোগে মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। ডাকুর নির্বাচনে জামাতের ছাত্র সংগঠনের এই উত্থান তারই প্রমান। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। এমনকি আওয়ামী সমর্থক পড়ুয়াদের এবার ভোট দিতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এই আবহে বিএনপি ও সদ্য তৈরি বিপ্লবী পার্টি এনসিপি-র ছাত্র সংগঠন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রার্থীরাও জামাতের ইসলামি ছাত্র শিবিরকে ঠেকাতে ব্যর্থ হল। যদিও ফল ঘোষণার পর ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম বলেন, এই জয় জুলাই বিপ্লবের জয়। তিনি আরও বলেন, ভিপি হিসেবে নয়, আপনাদের ভাই হিসেবে পরিচয় দিতে চাই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ভোটের ফল বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জামায়তে ইসলামীকে অনেকটাই এগিয়ে দিল। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামাতের সঙ্গে বিএনপির মতোবিরোধ আরও বাড়তে পারে এই ফলাফলের পর। কারণ, বিএনপির সঙ্গে জামাতের মত বিরোধ আরও চওড়া হবে। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ভাবধারা আরও বেশি প্রভাব ফেলবে ছাত্রশিবির ক্ষমতায় আসায়। বাংলাদেশে সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্র সংসদগুলিতে পদাধিকার বলে প্রেসিডেন্ট হন উপাচার্যরা। আর ছাত্রদের তরফে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ পদটি হল ভাইস প্রেসিডেন্ট বা ভিপি। ডাকসুর ভোটে ছাত্র শিবিরের প্রার্থীরা শেখ মুজিব হল, সূর্যসেন হল, বিজয় একাত্তর হল, বেগম রোকেয়া হল, জগন্নাথ হল, জিয়াউর রহমান হল, ফজিলাতুননেছা মুজিব হলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। সবমিলিয়ে ছাত্রশিবিরের রমরমা শুরু হল ডাকসুতে। আগে এখানে একছত্র আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ এবং বিএনপির ছাত্রদলের। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এবার নানা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আর উদারপন্থা গ্রহন করতে পারবে না। তার বদলে ইসলামী ভাবধারা, নানা ধরণের ফতোয়া জারি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। এনসিপি বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেন সাফল্য পেল না? এর কারণ হিসেবে অনেকেই বলছেন, মূলত জামাতের ছায়া সংগঠন হিসেবেই উঠে এসেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গত বছরের জুন-জুলাইয়ের আন্দোলনে পিছন থেকে জামাতের ছাত্রশিবিরই সবকিছু পরিচালনা করেছিল। তাই তাঁদের সংগঠন সেভাবে মাথাচারা দিতেই পারেনি, যা আছে ওপর ওপর। পাশাপাশি এনসিপি নেতাদের দাদাগিরিও ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামাতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতি এবার আরও জোরালো হতে চলেছে এ কথা বলাই বাহুল্য।












Discussion about this post