দিল্লিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর গোটা দেশেই একটা কৌতুহল ছিল, এটা কি সন্ত্রাসী হামলা? নাকি নিছকই অসাবধানবশত ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণ। বুধবার রাতেই নয়া দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনে ভারতের সুরক্ষাবিষয়ক ক্যাবিনেট কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়ে গেল। সেই বৈঠক শেষে সোমবারের ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’ বলে উল্লেখ করল নয়াদিল্লি। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে এবং কঠোর পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিষয়টির মোকাবিলা করতে বলা হয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে। তবে ভারত এখনও কোনও দেশকে সরাসরি দায়ি করেনি। যেমনটা আমরা দেখেছিলাম পহেলগাঁও হামলার পর ভারত সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ি করেছিল। কিন্তু এবার সেটা করা হয়নি সেটা লক্ষ্য করার বিষয়। তাহলে কি এই সন্ত্রাসী হামলার পিছনে অন্য কোনও সংগঠন রয়েছে? তদন্ত যত এগোচ্ছে ততই বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, আরও বড় সড় হামলার জন্য তৈরি হচ্ছিল এই সন্ত্রাসবাদীরা। কিন্তু মাঝপথেই ভারতের গোয়েন্দাসংস্থা ও জম্মুকাশ্মীর পুলিশ টের পেয়ে যায় তাঁদের পরিকল্পনা। ফলে একে একে ধরা পড়তে থাকে ওই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সদস্যরা। তখনই তড়িঘড়ি এই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে বলেই প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে। তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের নাম। আর সেই কারণেই ভারত সরকার বা গোয়েন্দা এজেন্সিগুলি কোনও সংগঠনের নাম উল্লেখ করেনি। কারণ, তদন্ত এখন চুরান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, দিল্লিকে ঘিরে যে বড়সড় নাশকতার পরিকল্পনা চলছিল, প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে এই বিস্ফোরণের নেপথ্যে রয়েছে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ। শ্রীনগরে এই পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর পোস্টার সাঁটাতে গিয়েই ধরা পরেছিল চিকিৎসক আদিল আহমেদ। সেই সময় অর্থাৎ প্রায় তিন সপ্তাহ আগে অক্টোবরের শেষের দিকে প্রথম ঘটনার আঁচ পায় জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ। আশ্চর্ষের বিষয়, জঙ্গিদের যে মডিউলটি এই ঘটনার সাথে যুক্ত, তাঁদের বেশিরভাগই চিকিৎসক। তাই এটাকে ‘হোয়াইট কলার’ মডিউল বলা হচ্ছে। কিন্তু গোয়েন্দাদের অনুমান, জইশ-ই-মহম্মদ সুপরিকল্পিতভাবে এই মডিউল পরিচালনা করছে অন্য কয়েকটি ছায়া সংগঠনের মাধ্যমে। জানা যাচ্ছে, তার মধ্যে আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ অন্যতম। আরেকটি সংগঠনের নামও উঠে আসছে তা হল, তবলিঘি জামাত। এই দুটি সংগঠনই বাংলাদেশে অতি সক্রিয়। তাই এবারের জঙ্গি বা সন্ত্রাসী হামলার নেপথ্যে শুধু পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ ও তুর্কির যোগসূত্রও খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারী সংস্থাগুলি। বিশ্লেষকদের অভিমত, এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবিনেট বৈঠকে এটাকে সন্ত্রাসী হামলা বলা হলেও সরাসরি কোনও দেশকে নিশানা করা হয়নি।
বিগত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশে একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ছত্রছায়ায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের বুকে পাকিস্তানের দাপাদাপিও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেটাও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির স্ক্যানারে রয়েছে। তবে দিল্লি বিস্ফোরণের তদন্তে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি যোগসূত্র পেয়ে গিয়েছেন তদন্তকারীরা। যেমন, এই বিপুল পরিমান বিস্ফোরকের একটা অংশ বাংলাদেশ হয়েই ভারতে এসেছিল বলে জানা গিয়েছে। অ্যামনিয়াম নাইট্রেট ভারতে সহজলভ্য হলেও মারাত্মক বিস্ফোরক তৈরি করতে ডিটোনেটর, জিলেটিন স্টিক বা অন্যন্য রাসায়নিক জোগার করা একটি কঠিন। বিশেষ করে যে মাত্রায় বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে বিগত কয়েকদিনে সেটা জোগার করা খুব কঠিন। যেটা জানা যাচ্ছে, চোরাপথে বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়েই সেগুলি ভারতে ঢুকেছে। পাশাপাশি আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ এবং তবলিঘি জামাত নামে দুটি সংগঠনই বাংলাদেশেও সক্রিয়। ঢাকায় তাঁদের দফতরও রয়েছে। দিল্লি বিস্ফোরণের পর আতস কাঁচের তলায় তবলিঘি জামাতের দফতর রয়েছে ঢাকার কাকরাইল এলাকায় রমনা পার্কের পাশে অবস্থিত একটি মসজিদে। এটির আদি নাম ছিল মালওয়ালি মসজিদ, বর্তমানে তার নাম কাকরাইল মসজিদ।
ভারতের সুরক্ষা বিষয়ক ক্যাবিনেট কমিটি দিল্লির ঘটনাতে সন্ত্রাসবাদী হামলা ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একই দাবি করলেন। তিনি এটিকে “স্পষ্টতই একটি সন্ত্রাসী হামলা” বলে অভিহিত করেছেন এবং ভারতের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি তাঁর দাবি, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি খুব ভালো কাজ করছে, এবং তদন্তের জন্য আমেরিকার কোনও সাহায্য ভারতের প্রয়োজন নেই।
অর্থাৎ, দিল্লিতে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তা আমেরিকাও মেনে নিল। আর সন্ত্রাসী হামলাকে যে ভারত যুদ্ধের হুমকি হিসেবেই দেখে সেটাও কার্যত মেনে নিল আমেরিকা। এবার দেখার ভারত অপারেশন সিঁদূরের পরবর্তী পর্যায় শুরু করে কিনা। আর বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এবার শুরু পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশকেও অপারেশন সিঁদূরের টার্গেট করা হবে।












Discussion about this post