প্রতিবেদনের সূত্রে রবীন্দ্রনাথের এই গানের উল্লেখ করতেই হচ্ছে-
‘উতল-ধারা, বাদল ঝরে। /সকল বেলা একা ঘরে।।/ সজল হাওয়া বহে বেগে, পাগল নদী ওঠে জেগে।/’ আর গানের শেষ লাইনে আছে ‘চোখে আমার ঝলক লাগে/ সকল মনে পুলক জাগে’।
কার জন্য এই গৌড়চন্দ্রিকা, তা আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। তদারকি সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে হুবহু মিলে যায় এই গানের প্রতিটি শব্দ। সত্যিতো তিনি একা। একা এবং একা। শারীরিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে তো তিনি একা। পুলিশের একাংশ তাঁর পাশে নেই। বাহিনীর একাংশের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আগে যে সব দল তাঁর পাশে ছিল, তারাও এখন আর তার পাশে নেই। তাই, তিনি মানসিকভাবে একাকিত্বে ভুগছেন। এই অবস্থায় তাঁকে মানসিক শান্তি দিতে পারে হাসিনা এবং তাঁর প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের প্রত্যর্পণ। আসাদুজ্জামনও দিল্লিতে রয়েছেন বলে অনুমান। তবে হাসিনা যে দিল্লিতে আছেন, তা নিয়ে কারও মনে কোনও দ্বিমত নেই। সে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। প্রশ্ন হচ্ছে দিল্লি কি তাঁকে ঢাকার হাতে তুলে দেবে। এককথায় না। তাঁর কারণ রয়েছে। এর জন্য আমাদের ইতিহাসের পাতার দিকে নজর রাখতে হবে।
চিন থেকে ভারতে চলে আসেন দলাই লামা। যে সময়ের ঘটনা, সেই সময় চিন সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত বলীয়ান একটি রাষ্ট্র। চিনের চোখে চোখ রেখে ভারত জবাব দিয়েছিল ড্রাগনের হুঙ্কারের কাছে সিংহের গর্জন হার মানে না। সেই থেকে দলাই লামা ভারতে রয়ে গিয়েছেন। আফগানিস্তানের মহম্মদ নাজিবুল্লাহ আহমেদজাইয়ের কথাও উল্লেখ করতে হয়। উল্লেখ করতে হয় মালদ্বীপের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ নাসিরের কথাও। এদের একজনকেও দিল্লি সে দেশের হাতে তুলে দেয়নি। দিল্লির বিদেশনীতি তো সেরকম। শত হলেও ভারত একটি মানবিক রাষ্ট্র। তবে হাসিনার ক্ষেত্রে বিষয়টি কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।
ভারতের কাছে শেখ হাসিনার পরিচয় শুধুমাত্র সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি উত্তর পূর্বাঞ্চলের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙতে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলে, সেটা ভারতীয় জাতীয় রাজনীতি এবং নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রে একটা মাইলস্টোন। দিল্লি এই স্মৃতি ভুলবে না। দিল্লি হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে। প্রথমত মানবিকতা, দ্বিতীয় কারণ কৌশলগত স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা। আলফা নিশ্চিহ্ন করার পিছনে হাসিনার ভূমিকার কথা মনে আছে সাউথব্লকের।
প্রবলভাবে দৃশ্যমান অন্তরীনে থাকা হাসিনা কিন্তু একটা কথা বারবার বলেছেন তিনি দেশ ফিরতে চান। হাসিনার বিবৃতি নিছক রাজনৈতিক নয়। জাতীয় রাজনীতির প্রতি যে তিনি দায়বদ্ধ, সেটা স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, জীবন বাজি রেখে ক্ষমতায় থাকার কোনও ইচ্ছা তাঁর নেই। মানুষ হত্যা করে তিনি ক্ষমতায় থাকতে চান না। তাঁর কথায় মানুষ মরছে। আর সেই রক্তপাতের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় থাকবেন না। হাসিনা এটাও বুঝে যান স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ার পথটা কেউ তাঁকে দিতে চাইছে না। এই প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, ‘আমি জানতাম না আমাকে দেশের বাইরে নিয়ে আসবে। আমি জানতাম আমাকে টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যাচ্ছে।’ বঙ্গবন্ধু কন্যা এও বলেছেন, তিনি দেশে ফিরে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে পিছ পা নন। কিন্তু দেশে ফেরার মতো পরিবেশ তৈরি হলেই তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন।












Discussion about this post