বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বললেন, তা শুনে মনে পড়বে মাইকেলের বীরাঙ্গনা কাব্যের সেই বিখ্যাত লাইন – এ কি কথা শুনি আজি মন্থরার মুখে।
যে মানুষটা কিছুদিন আগে দিল্লিকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছিলেন, এখন সেই মানুষটাই বলছে তিনি দিল্লিকে শাস্তি দিয়েছেন। শুনতে কেমন একটা লাগছে না। যা পড়লেন, সেটাই পড়লেন। সর্বশক্তিমান ট্রাম্প এখন রীতিমতো অনুতপ্ত। ট্রাম্প বর্তমানে ব্রিটেন সফরে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মারের সঙ্গে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে আমেরিকার সাদাবাড়ির কর্তা বলেন, তেলের দাম কমে গেলেই যুদ্ধের পথ থেকে সরবেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। তাই, তিনি ভারতের ওপর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা।
ওই সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনারা তো জানেনই আমি ভারতের খুবই ঘনিষ্ঠ। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁকে ফোন করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। উনিও খুব সুন্দর বার্তা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও আমি ভারতকে শাস্তি দিয়েছি। ’ ট্রাম্পের বক্তব্য, ‘ইউরোপীয় দেশগুলি রাশিয়ার তেল কিনছে। অথচ আমি রাশির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছি। চিন যুক্তরাষ্ট্রকে এখন প্রচুর শুল্ক দিচ্ছে। আমি অন্য কিছু করতে রাজি। তবে যখন যাদের হয়ে আমি লড়ছি তারাই যদি রাশিয়ার তেল কেনে, তখন সেটা মেনে নেওয়া যায় না। তবে তেলের দাম নেমে এলে রাশিয়া সমঝোতায় বাধ্য হবে।’
এখন প্রশ্ন হল ট্রাম্প কেন এমন বেসুরো কথা বলছেন, সেটা একটু খতিয়ে দেখা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলে খুব চাপে পড়ে গিয়েছেন। চাপে পড়ার কারণ, দিল্লির সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক এখন বেশ মাখো মাখো। সে দেশ থেকে দিল্লি অশোধিত তেল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাশিয়াও ব্যারেল পিছু তেলের দাম অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। সেটাই এখন ট্রাম্পের কাছে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধুই নয়াদিল্লিই নয়, ট্রাম্পের মুখ উঠে এসেছে বেজিং ও মস্কোর কথাও। তিনি বলেন, ‘চিন আমাদের অনেক টাকা শুল্ক দিচ্ছে।’ আর রাশিয়ার প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘ওদের তেলের দাম একদম পড়ে গিয়েছে। পুতিনকে এবার যুদ্ধ থেকে সরে আসতেই হবে। ওদের কাছে আর কোনও উপায় নেই।’
প্রসঙ্গত, চলতি সপ্তাহে মুখোমুখি সমঝোতা বৈঠকে বসেছিল নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রিডেন লিঞ্চের সঙ্গে শুল্ক আলোচনায় বসেছিলেন ভারতের মুখ্য বাণিজ্য সমঝোতাকারী রাজেশ আগরওয়াল। আর তারপরেই নয়াদিল্লিতে আবহ বদল। ট্রাম্পের সঙ্গে যে বিবাদ মিটছে, তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছেন একাংশ। দেশের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরনের দাবি, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কমে যাবে শুল্কের পরিমাণ। তাঁর অনুমান, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে জরিমানা-শুল্ক সরিয়ে নেবেন ট্রাম্প। কমাবেন পারস্পরিক শুল্কের হারও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্প বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন, তিনি ভারতকে যতই ভাতে মারার চেষ্টা করুন না কেন, ভারত পরিত্রাণের একটা না একটা রাস্তা ঠিক বের করবে। সেই রাস্তা দিল্লি বের করে নিয়েছে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী। তাদের মতে, দিল্লিকে প্যাঁচে ফেলতে গিয়ে ট্রাম্প নিজেই প্যাঁচে জড়িয়ে গিয়েছে। এখন সেই প্যাঁচ ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। কোনোভাবে দিল্লিকে একটু কাছে টানা যায়, তাহলে আখেরে লাভ তাদের, সেটা ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন। দিল্লির মন জয় তিনি করতে পারলেন কি না, সেটা সময় বলবে।












Discussion about this post