বাংলাদেশে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেফতার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। জানা যাচ্ছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি বেশ কয়েকদিন ধরেই তাঁদের দিকে নজরদারি রাখছিলেন। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই ভারত-বাংলাদেশের বনগাঁ সীমান্তের কাছে একটি গ্রামে হানা দেয় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা। এরপরই দুই অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগির হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই দুজনই বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের নেতা তথা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে পরে জানায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বরে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড ঘিরে বাংলাদেশজুড়ে তুমুল চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। কার্যত উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেছিল হাদি হত্যার দায় ভারতের উপর চাপাতে। সেই সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চ, এনসিপি-সহ একাধিক সংগঠন হাদি হত্যাকাণ্ডের পিছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে বলেই সরাসরি অভিযোগ জানাতে থাকে। একটা সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছিল হাদির হত্যাকারীরা ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। একবার এমন দাবিও করা হয়েছিল যে কলকাতা পুলিশ মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু প্রথম থেকেই ভারত সরকার এই দাবিগুলি অস্বীকার করে এসেছে। এবার তাঁরা ভারত থেকেই গ্রেফতার হল। ফলে ঢাকা পুলিশের দাবি কার্যত মান্যতা পেল বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এবার ভারত কি করবে? বিশ্লেষকদের মতে, ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেফতারের পর ভারতের উচিত পরবর্তী তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা। কারণ, হাদিকে হত্যার পেছনে কাদের কাদের হাত ছিল তা সামনে আসা প্রয়োজন। জানা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের জেরায় ইতিমধ্যেই দুই ধৃত মুখ খুলেছে। একাধিক সূত্র জানাচ্ছে হাদিকে হত্যার আসল উদ্দেশ্য ছিল ভোটের আগে বাংলাদেশে একটা অস্থিরতা তৈরি করা। যাতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করে দেওয়া যায়। ফলে এই দুজনকে যদি বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া যায়, তাহলে দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে যাবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, জামাত-এনসিপি হাদি হত্যা নিয়ে এত সরব ছিল, তাঁরা এখন মুখে কুলুপ এঁটেছেন। অর্থাৎ, হাদির খুনিরা ধরা পড়ায় আতঙ্কিত এনসিপি।
অপরদিকে, বাংলাদেশের তারেক রহমান সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ধৃত দুই দুষ্কৃতিকে দ্রুত হেফাজতে চাইছে বাংলাদেশ সরকার। সে দেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সোমবার ঢাকায় বলেছেন, সরকার কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে। একই কথা বলেছেন, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদও। তিনি জানিয়েছেন হাদি হত্যাকারীদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকার সক্রিয়। ইতিমধ্যেই বিদেশ মন্ত্রকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে। বন্দি-বিনিময় চুক্তির আওতায় তাঁদের ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করা হবে।
কূটনৈতিক সূত্রের খবর, ভারত সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত দুই দুষ্কৃতিকে গ্রেফতারের বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তবুও কলকাতার উপ দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার শিকদার মহম্মদ আশরাফুর রহমানের অফিস রবিবার রাতেই সক্রিয় হয়েছে। ধৃত দুজনকে হেফাজতে পাওয়া বা জেরা করার জন্য ভারত সরকারের কাছে কনস্যুলার এক্সেস চেয়েছেন তিনি। কলকাতায় বাংলাদেশের উপ দূতাবাসে তরফে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ফয়সাল করিম মাসুদ এবং আলমগীর হোসেন নামের ধৃত দুই দুষ্কৃতীকে ভারতীয় গণমাধ্যম শরিফ ওসমান বিন হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাঁদের বিষয়ে কনস্যুলার এক্সেস দেওয়া হোক। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এ বিষয়ে ভারত সরকারের উচিৎ হবে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। তবে ভারতীয় গোয়েন্দারা এবং পুলিশ আধিকারিকরা প্রথমেই নিশ্চিত হতে চাইবেন এই দুজনই ওসমান হাদির হত্যাকারী কিনা। পাশাপাশি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা করার পর ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে রিপোর্ট যাবে। তারপরই মূল সিদ্ধান্ত নেবে ভারত সরকার। এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। কিন্তু হাদি হত্যার বিচারে ভারত যদি তারেক রহমান সরকারকে পূর্ণ সহযোগীতা করে, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতিতে সহায়ক হবে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।












Discussion about this post