রাজনীতিতে অভিজ্ঞরা সময় বুঝে মুখ খোলেন। সময় বুঝে আস্তিনের নীচে লুকিয়ে রাখা ট্রাম্পকার্ড বের করে খেলা ঘুরিয়ে দেন। কখন কী বিষয়ে বললে সমর্থক থেকে শুরু করে আম আদমির মন জয় করা যাবে সেটা একমাত্র তারাই উপলব্ধি করতে পারেন, যারা রাজনীতির ময়দানে দীর্ঘদিন ব্যাটিং করে গিয়েছেন। তাদের বক্তব্য প্রতিপক্ষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দেয়। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রত্যাঘাত করার আর কোনও সুযোগ থাকে না।
এই গৌড়চন্দ্রিকা হাসিনাকে নিয়ে। দেশ ছাড়ার পর থেকে তিনি দিল্লিতে রয়েছেন। সেখান থেকে তিনি তাঁর দলীয় কর্মীদের একের পর এক নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন। আর সেই সব নির্দেশে তদারকি সরকার প্রধান পড়েছেন মহা ফাঁপড়ে। সর্বশেষ হাসিনার বক্তব্য শোনা গিয়েছে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত এক সমাবেশে। দিয়েছেন অডিও বার্তা। ‘সেভ ডেমোক্র্যাসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে তদারকি সরকার প্রধানকে বাক্যবাণে বিঁধেছেন। তিনি উপস্থিত না থাকলেও তাঁর ভাষণ ছিল কঠোর, আবেগপ্রবণ ও আক্রমণাত্মক। তিনি বারবার মুহাম্মদ ইউনূসকে “খুনি ফ্যাসিস্ট”, “সুদখোর”“ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক” বলে আখ্যা দিয়েছেন। ভাষণ শুরু করেন এই বলে যে “আজ বাংলাদেশ এক ভয়াবহ খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ”। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি সংকট উত্তরণে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। সেই পাঁচ দফা দাবি হল – ১) অবৈধ ইউনূস প্রশাসনের অপসারণ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সুনিশ্চিত করা, ২) সহিংসতা এবং আইনহীনতার অবসান, ৩) সংখ্যালঘু, নারী ও দূর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ৪) রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা ও বিচারকার্যে হয়রানি বন্ধ করা এবং ৫) জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর নিরপেক্ষ তদন্ত। সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা – আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আপনাদের সঙ্গে আছে।
হাসিনার এই বার্তায় মেজাজ হারিয়েছেন তদারকি সরকার প্রধান ইউনূস। তার সরকারের তরফে দেওয়া হয়েছে কড়া প্রতিক্রিয়া। তদারকি সরকারের বক্তব্য, হাসিনাকে বলার অনুমতি দেওয়ার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে একটা অস্থির পরিবেশ তৈরি করার প্রচেষ্টা হচ্ছে। তদারকি সরকার চাইছে, আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে ও শান্তিপূর্ণ হোক। কিন্তু দিল্লি সেটা চায় না, চাইছেন না হাসিনা। তাই, বারে বারে তাকে বলার জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে।
সকলেই প্রায় নিশ্চিত ছিলেন তদারকি সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক খেলায় আপাতত কিছুদিনের জন্য ইতি টানবেন। ভোট মিটে গেলে হয়তো তিনি নতুন কোনও কৌশল নেবেন। কিন্তু রাজনীতিতে পোড় খাওয়া নেতাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা অনুমান করা বেশ মুশকিল। হাসিনা তাঁর অন্যতম উদাহরণ। এবার তিনি মাঠে নামালেন পুত্র জয়কে।
কলকাতা বইমেলায় একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। দীপ হালদার, জয়দীপ মজুমদার, শাহিদুল হাসান খোকনের লেখা ‘ইনশআল্লাহ বাংলাদেশ’ বই প্রকাশ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেই আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যোগদান করেন হাসিনাপুত্র জয়। কী বলেছেন জয়?
কোটা আন্দোলন সম্পর্কে জয়ের মন্তব্য “ কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দাবি ন্যায্য ছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকার বহু আগেই কোটা সরিয়ে দিয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে আবার তা ফেরাতে হয়।” জয়ের কথায়, তাঁর দল বিষয়টি আদালতের ওপর ছেড়ে দেয়। আর এই সিদ্ধান্ত যে তাঁর সরকারের একধরনের ব্যর্থতা, সেটা জয় একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন।
কোটা আন্দোলন পরবর্তীকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বদলে যায়। আর সেই আন্দোলনের জেরে পতন ঘটে হাসিনা সরকারের। বঙ্গবন্ধু কন্যার মতে, সুপরিকল্পিতভাবে তাঁর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ ওঠে, এই আন্দোলনকে দমন করতে মরীয়া হয়ে ওঠে হাসিনা সরকার। তা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন ওঠে। কলকাতা গ্রন্থমেলায় আয়োজিত ভার্চুয়াল বক্তৃতায় জয় তা নিয়ে মুখ খুললেন। হাসিনাপুত্র বলেন, “আমার মায়ের কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিং আদালতে পেশ করা হয়েছে। সেখানে আপনারা শুনতে পাবেন জঙ্গিরা থানায় হামলা করেছে। ওই সময় পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। অনেক নিরপরাধ বিক্ষোভকারী এবং সাধারণ জনতা আক্রান্ত হন। প্রতিটি মৃত্যুই দুর্ভাগ্যজনক। ” তবে এই ক্ষেত্রে তিনি জঙ্গি বলতে তিনি আন্দোলনকারীদের বোঝাচ্ছেন না তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।
কথা বলেছেন নির্বাচন নিয়েও। জয় বলেন, “আপনারা জানেন এখন একটা সাজানো নির্বাচন হতে চলেছে। নির্বাচন নয়, সিলেকশন। মৌলবাদী নয়, এমন দলগুলিকে নির্বাসন করা হয়েছে। নির্যাতনের স্বীকার জাতীয় পার্টি। পোস্টাল ব্যালট দিয়ে ভোট বাড়িয়ে নির্বাচন করা হবে। ১৫০-র বেশি ভোট পাবে না বিএনপি। জামাত ১২০টি সিট পাবে। আপনি ভোট দিন বা না দিন এই রেজাল্ট আগে থেকেই নিশ্চিত করা হয়েছে। একক ক্ষমতা আসবে না বিএনপি। ” বাংলাদেশবাসীদের জন্য জয়ের বার্তা – “আমার অনুরোধ আপনারা কেউ ভোট দিতে যাবেন না। বাংলাদেশকে সুরক্ষিত করুন। শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সমর্থক নয়। সবার জন্য এই বার্তা। সংবিধান রক্ষা করতে চাইলে এটা করুন। ”












Discussion about this post