‘ন্যায় ও শান্তি আলাদা কোনও আদর্শ নয়;তারা একে অপরের শর্ত। ন্যায় ছাড়া শান্তি কেবল এক ভ্রম, ন্যায় ছাড়া শান্তি ছা়ড়া কেবল এক ভ্রম, আর শান্তি ছাড়া ন্যায় অসম্পূর্ণ। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয় – এটি ভবিষ্যতের শান্তিকে রক্ষা করার একমাত্র পথ। যেখানে এক জায়গায় অন্যায়কে আমরা উপেক্ষা করি, সেখানে সর্বত্র ন্যায়ের ভিত্তি কাঁপতে শুরু করে। যে কোনও স্থানে অন্যায় মানে সর্বত্র ন্যায়ের জন্য হুমকি। শান্তি কেবল সংঘাতে অনুপস্থিতি নয়, বরং ন্যায়ের উপস্থিতি।’
এই দর্শন মার্টিন লুথার কিংয়ের।বাংলাদেশের অতীত এবং বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বিশ্ববন্দিত এই মানবাধিকার কর্মীর এই আত্মদর্শন ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা খাঁটি। ন্যায় এবং শান্তি আলাদা কোনও আদর্শ হতে পারে না। যে কোনও একটি সরকারের দায়িত্ব অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। সেটা না নিলে ভবিষ্যতে শান্তিকে রক্ষা করার পথও বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশে ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর তদারকি সরকার প্রধান একের পর এক অন্যায় করে গিয়েছেন। সে কারণে বাংলাদেশ আজ নিবির ঘন আঁধারে ডুবে গিয়েছে।
প্রথম অবৈধ কাজ অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করা। শুধুমাত্র ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশের মসনদে আসীন হয়েছিলেন। তাই শেষ হয়েও হইল না শেষ। নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১০ দিন। সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। পদ্মাপারে এর আগেও হয়েছে ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু সেই সব সরকার তাদের বিদায় বেলাতেও এমন কোনও পদক্ষেপ করতে দেখা যায়নি, যা বিতর্কের জন্ম দেয়। কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
জনতার দেওয়া করের টাকা খরচ করে একাধিকবার বিদেশ সফর করেছেন। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন তাঁর পছন্দের ব্যক্তিদের। রাষ্ট্র সংস্কারের নামে ছয়টি কমিশন গঠন করেছেন। সংবিধানের বিলুপ্তি ঘটাতে তৈরি করেছেন জুলাই সনদ। সেই সনদের সপক্ষে প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন। দেশবাসী যাতে আসন্ন ভোটে গণভোটের পক্ষে তাদের মত দেয়, তার জন্য হ্যাঁ ভোটের সংস্থান রেখেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বিদেশি সংস্থার হাতে তুলে দিয়েছেন। মিরসরাইতে সমরাস্ত্র অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে তৈরি করেছেন নতুন আইন।
জুলাই আন্দোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে যাতে কোনও আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তার জন্য সরকার জারি করেছে অধ্যাদেশ। জুলাই আন্দোলনে শহিদের একটি তালিকা সরকার তৈরি করেছে। প্রকাশ করা হয়েছে গেজেট। সরকার ৭৭৫টি শহিদ পরিবারের জন্য ১০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ও ভাতা এবং ১৩, ৮০০ আহতদের জন্য ১৫৩ কোটি টাকা দান করেছে। এটা পরবর্তী সরকারের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টমহল।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো তৈরি করেছেন। সচিবদের বেতন বর্তমানে ৭৮ হাজার টাকা। প্রস্তাব করা হয়েছে এক লক্ষ ৬০ হাজার টাকা বৃদ্ধির। এর সঙ্গে যুক্ত হবে অন্যান্য ভাতা। সব মিলিয়ে একজনের বেতন ছাড়াতে পারে তিন লক্ষ টাকা। বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। কমিশনের সুপারিস বাস্তবায়িত হলে এই খাতে খরচ বাড়বে এক লক্ষ কোটি টাকা। মোট বাজেটের ২০ শতাংশ শুধুমাত্র সরকারি কর্মীদের বেতন ও ভাতা দিতেই খরচ হয়ে যাবে। বাজেটে বলা হয়েছে আগামীদিনে যে সরকার আসবে, এই সিদ্ধান্ত তারা কার্যকর করবে।
মন্ত্রীদের জন্য সরকার বানাবে আবাসন। নয় হাজার ৩০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বানাবে সরকার। ঢাকার মন্ত্রীপাড়ায় তিনটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই সব ভবনে ৭২টি ফ্ল্যাট, যার আয়তন হবে ৮,৫০০ থেকে ৯, ৩০০ বর্গফুট। এর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৭৮৬ কোটি টাকা। নতুন তিন ভবন হবে বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে। থাকবেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।
গণমাধ্যম কমিশন এবং সম্প্রচার কমিশন নামে দুটি কমিশন গঠন করেছে তদারকি সরকার। গণমাধ্যম কমিশন সরকারের কাছে একটি রিপোর্ট পেশ করেছিল। সেখানে কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তদারকি সরকার প্রধান সেই সব কার্যকর করার প্রয়োজন বোধ করেনি। তারা তাদের মতন করে দুটি কমিশন গঠন করেছে। বলা হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে এই দুটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। তদারকি সরকারের আমলে গণমাধ্যম কতটা স্বীধানভাবে কাজ করতে পেরেছে, তা আর নতুন করে বলার দরকার পড়ে না। কমিশনে মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র তিনদিন সময় দেওয়া হয়েছিল। চিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইউএএভি ড্রোন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে তদারকি সরকার। এই নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তিও হয়েছে। চিন ৬০৮ টাকা বিনিয়োগ করবে।
তদারকি সরকার যে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই সব সিদ্ধান্তের কিছু তারা কার্যকর করতে পেরেছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠই বকেয়া থেকে গিয়েছে। সেটা পরবর্তী সরকারের কাঁদে সঁপে দিয়েছেন। বিদায় বেলায় তদারকি সরকার ৪৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে গেল। এটা যে নিছক ষড়যন্ত্র, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।












Discussion about this post