২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে লিপিবদ্ধ থাকবে। ওইদিন এক তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং ক্ষমতাচ্যুত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই গণ-আন্দোলন বা অভ্যুত্থান যেভাবেই এ বিষয়কে দেখা হোক না কেন এটা যে স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার ছিল না, তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। বাংলাদেশের পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই ওই অভ্যুত্থানকে একটি মেটিকুলাস ডিজাইনের অঙ্গ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন। অর্থাৎ এটি একটি গভীর পরিকল্পনার ফসল। আর এই গভীর পরিকল্পনাটি যে মার্কিন মুলুকেই হয়েছিল তাও আজ স্পষ্ট। যাইহোক, পরবর্তী সময় এটাও বোঝা গিয়েছে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এই গণঅভ্যুত্থানকে প্রচ্ছন্ন মদত দিয়েছিলেন। এবং এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। যদিও এই সরকারের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসকে তিনি বসাতে পক্ষপাতী ছিলেন না। তবে আন্দোলনকারী ছাত্রদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করতে হয়েছিল জেনারেল ওয়াকারকে। এরপর বহুবার বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের মধ্যে বিবাদ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কিন্তু এবার তাঁদের মধ্যে বিবাদ বেশ জটিল।
বাংলাদেশের বহু আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর খুব বেশি দেরী নেই। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হবে সংসদ নির্বাচন এবং একইসঙ্গে হবে গণভোট। মুহাম্মদ ইউনূস নিজে, এবং তাঁর সমর্থকরা গণভটে “হ্যাঁ”-কে জেতাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে গণভটে “হ্যাঁ” জয়যুক্ত হলে আগামী নির্বাচিত সাংসদরা, বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনকারী গণপরিষদের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন পরবর্তী ছয় মাস পর্যন্ত। এর জন্য নির্বাচন পরবর্তী একটি জাতীয় সরকার গঠনের যাবতীয় তোড়জোড় চালিয়ে যাচ্ছে ইউনুস ও তাঁর সঙ্গী জামাত-এনসিপি। আওয়ামী লীগকে বাদ রেখে এই নির্বাচনে যাতে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় সেদিকেও চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। তবে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী মুখ্য সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মাঠে নেমে কাজ করছে। ফলে মুহাম্মদ ইউনূস বোঝেন এর জন্য সেনাবাহিনীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তাঁর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর থেকে একমাত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেই তিনি নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি। তিনি এবং তাঁর দোসররা বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলেন জেনারেল ওয়াকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সেনাবাহিনীর ভিতরে একটি ক্যু বা অভ্যুত্থান করানোর। সেই চেষ্টা বিফলে গিয়েছে। এবার ইউনূসের সামনে একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ এসেছে। জানা যাচ্ছে, চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারী অবসর গ্রহণের আগে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম বাধ্যতামূলক ছুটিতে যাওয়ার পর চিফ অফ জেনারেল স্টাফ বা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিজিএস পদটি শূন্য হয়েছে। এখন ইউনুস সাহেব চাইছেন ওই পদে নিজের পছন্দের কাউকে বসিয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গঠনতন্ত্র অনুসারে এই সিজিএস পদটি ঠিক সেনাপ্রধানের নিচে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ দাবি করছে, চিফ অফ জেনারেল স্টাফের শূন্য পদ পূরণ নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে নতুন করে বিবাদ সৃষ্টি হয়েছে।
যেটা জানা যাচ্ছে, মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরবর্তী সিজিএস নিয়োগের বিষয়ে মুখোমুখি বিবাদে জড়িয়ে গিয়েছেন। যেখানে জেনারেল ওয়াকার উজ জামান সেনাবাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমানকে ওই পদে চাইছেন, সেখানে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানকে সিজিএস পদে চাইছেন। সংঘাতের সূত্রপাত এখানেই। উল্লেখ্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সিজিএস পদটি কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিক নয়। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যাবতীয় অপারেশনাল কাজকর্ম যেমন তদারকি করেন, তেমনই বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেনাকাটা বা কোন অস্ত্র কিনতে হবে সেটাও ঠিক করেন। ফলে এই পদে যদি মুহাম্মদ ইউনূস নিজের পছন্দের সেনা জেনারেলকে বসিয়ে দিতে পারেন তাহলে কেল্লাফতে। এটাই আটকানোর জন্য মরিয়া চেষ্টা করে চলেছেন জেনারেল ওয়াকার।
উল্লেখ্য সিজিএস পদে বহাল হতে হলে ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানকে জেনারেল পদে উন্নীত হতে হবে। যেটা হওয়ার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেন ওয়াকারপন্থী সেনা জেনারেলরা। কারণ তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তিনি বিএনপি নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বলে জানা গিয়েছে। ফলে আবারও নতুন করে সংঘাতে জড়িয়েছেন বাংলাদেশের দুই প্রবল ক্ষমতাসীন ব্যক্তি। এখন দেখার ভোটের আগে কে জেতেন!












Discussion about this post