প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মাস খানেক আগে ভাবনগরে একটি জনসভা করেন। সেই জনসভায় তাঁকে বলতে শোনা যায় ‘আগার হামারা কোই দুশমন হ্যায় তো উয়ো হ্যায় দুশরে দেশো পর হামারি নির্ভরতা। ইয়ে হামারা সবসে বড়া দুশমন হ্যায়। আর হামে মিলকর ভারতকে ইয়ে দুশমন কো নির্ভরতাওয়ালে দুশমন কো হারানাহি হোগা। হামে ইয়ে বাত হামেশা দোহরানি হ্যায়। জিতনি জাদা বিদেশি নির্ভরতা উতনি জাদা দেশকি বিফলতা। বিশ্বমে শান্তি, স্থিরতা, আঔর সমৃদ্ধিকে লিয়ে দুনিয়া কি সবসি আবাদিওয়ালি দেশকো আত্মনির্ভর বননাহি হোগা। ’
ভারত যে আজ আত্মনির্ভর, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ভারত আজ এক মজবুত অর্থনীতির ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। ভারতের এই আত্মনির্ভরতায় সব থেকে বেশি যদি কোনও দেশ বিচলিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই দেশটির নাম আমেরিকা। যে দেশের প্রেসিডেন্ট শুল্ক নিয়ে কিছুদিন আগেও ছিলেন অনড়, সেই শক্তিধর ডনকে আজ কার্যত ভারতের কাছে হাতজোর করতে হচ্ছে। সরাসরি না হলেও ঘুরিয়ে স্বীকার করে নিয়েছেন পরাজয়। তাই, তারা তাদের তৈরি প্যাক্স সিলিকায় ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছেন। এর দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। একটি ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, সেই সঙ্গে চিনের আধিপত্যবাদকে খর্ব করা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য অবশ্যই বাংলাদেশ। চিন যাতে কোনওভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সাঁট করে বাংলাদেশের ওপর তাদের প্রভাব কায়েম করতে পারে, তার জন্য আমেরিকার সাদা বাড়ির বড়ো কর্তা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
খুব সহজ কথায় এটি প্রযুক্তির দুনিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট। ভারতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর জানুয়ারিতেই জানিয়ে ছিলেন তাদের এই জোটে ভারতকে খুব তা়ডাতাড়ি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। দেওয়া হবে পূর্ণ সদস্যপদ। কিন্তু কি এই প্যাক্স সিলিকা?Pax শব্দটি ল্যাটিন। এর অর্থ শান্তি। সিলিকন বা চিপ প্রযুক্তির মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যেই এই মহাজোট। কথায় আছে চকচক করলেই সোনা হয় না। সেই সূত্র ধরে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে হঠাৎ আমেরিকার কেন মনে হল ভারতকে তাদের এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। প্রধান দুটি কারণ ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুটি ছাড়াও আরও একটি কারণ রয়েছে।
অতিমারি আমেরিকার মতো বৃহৎ একটি শক্তিশালী দেশকে টলিয়ে দিয়েছিল। বিশ্ব নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল চিনের ওপর। তাতে ভেঙে যায় সাপ্লাই চেন। ঘটনায় আমেরিকা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। প্যাক্স সিলিকার ভাবনা সেই সময়ে। আমেরিকা চাইছে, বিরল খনিজ থেকে চিপ তৈরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে লজিস্টিক – পুরোটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকুক। চিন অর্থনৈতিক দিক থেকে যেমন উন্নত প্রযুক্তিগত দিক থেকেও তারা আমেরিকাকে টেক্কা দিতে পারে। সাম্প্রতিক অতীতে প্রযুক্তিক্ষেত্রে তাদের কিছু উদ্ভাবন বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। প্যাক্স সিলিকা ডিজিটাল আয়র কার্টেন। আমেরিকা ছাড়া এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশগুলি হল জাপান, কোরিয়া প্রজাতন্ত্র, নেদারল্যান্ডস, ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর, ইজরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, অস্ট্রেলিয়া।
অনেকে বলছেন, ভারত এই জোটে যোগ দিলে আখেরে দেশ উপকৃত হবে। আত্মনির্ভর ভারত আগামীদিনে এই জোটের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। মোদি সরকার কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ভারত সেমি কন্ডাকটার হাব হতে চায়। এই জোটে থাকলে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেশগুলির থেকে উন্নত প্রযুক্তি, সেই সঙ্গে বিপুল বিনিয়োগ পাওয়া সম্ভব হবে। আমেরিকা এর আগে এই ধরনের আরও একটি জোট তৈরি করেছিল। সেই জোটের নাম ছিল মিনারেলস সিকিউরিটি পার্টনারশিপ। ভারত যোগ দেয় ২০২৩ সালে। এই জোটে যোগ দিলে মহামারি বা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে চিপের জোগান দেওয়া অব্যাহত থাকবে। হ্রাস পাবে চিন নির্ভরতা।
আমেরিকা ভারতকে এই জোটে রাখতে চাইছে তার অন্যতম কারণ ভারতীয়দের মেধা। এই প্রসঙ্গে সার্জিও গোরের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তাঁর মতে ভারত এখন আমেরিকার টেক পার্টনার। এর সঙ্গে হাসিনা বা বাংলাদেশের সম্পর্ক কোথায়? দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা অনেকটাই আবর্তিত হচ্ছে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশকে নজরে রেখেছে চিন। পদ্মায় ড্রাগন একবার সাঁতার কাটার সুযোগ পেলে আমেরিকা এবং ভারতের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। প্যাক্স সিলিকায় ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আটকে যাবে। আমেরিকা ও ভারতের লক্ষ্য এখন একটাই যে কোনও মূল্য বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা।












Discussion about this post