দেশের মাটি হয়ে উঠেছে বিদ্বেষের মাটি। শুরু হয়েছে ঘৃণা ভাষণের উদগিরণ। গত জুলাই-অগাস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসলে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে একজন অযোগ্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ক্ষমতার জিওনকাঠি। প্রথমদিকে কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর মনে বদ্ধমূল একটি ধারণার জন্ম হয়েছিল, ক্ষমতা যাঁকে হস্তান্তর করা হয়েছে, সে দেশকে একটি অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। তিনি নিজেও সেকথা দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিগত ১৫-১৬ মাসে এই দেশ এবং গোটা দুনিয়া দেখল ভদ্রলোক দেশটিকে কার্যত পদ্মায় ডুবিয়ে দিয়েছেন। যাঁরা কোনওদিন মাথা তোলার সাহস দেখাত না, এখন তারা শুধু মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। কার্যত একটি দেশকে বকলমে পরিচালনা করছে। সরকারের বিদেশনীতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। সরকার কাকে কাছে ডাকবে, কাকে দূরে ঠেলে দেবে, সেটা তারাই ঠিক করে দিচ্ছে। ডেভিড বার্গম্যান বলছেন, ‘বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও সোচ্চার গোষ্ঠী রয়েছে, বিশেষ করে ডানপন্থী এবং ইসলামি ডানপন্থীরা – যাদের ধারণা হল তারা যাদের ঘৃণা করে (যেমন বর্তমানে ভারত, আওয়ামী লীগ ইত্যাদি) আপনি যদি তাদের মতো করে এবং ঠিক ততটাই ওই পদক্ষেপগুলো ঘৃণা না করেন, তবে আপনি তাদের শত্রু।’
আক্ষরিক অর্থেই ভারত আজ শত্রু। শত্রু হাসিনা, তাঁর দল। আর তারেক রহমানকে যেভাবে বরণ করা হল, তাতে তো ভারত বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দায়বদ্ধ সরকার হলে আদালতে সাজাপ্রাপ্ত কোনও আসামীকে এভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া যায়। দিয়েছে আবার সেনাবাহিনী, যে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একসময় তাঁকে সরব হতে দেখা যায়। যে সেনাবাহিনীর ভয়ে তিনি দেশে ফিরতে পারছিলেন না। নিশ্চিত ছিলেন, দেশের মাটিতে পা রাখলে তাঁর জেলের ভাত খাওয়া নিশ্চিত। সে কারণে শুরুতেই বলা হয়েছে গত জুলাই-অগাষ্টের অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে। একজনের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে আরও একজনের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর যিনি ক্ষমতা পেলেন, তিনি ক্ষমতার সদ্ব্যবহার না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করলেন। রেখে-ঢেকে নয়, প্রকাশ্যে, বুক চিতিয়ে।
তাই তো ৩২ নম্বর ধানমন্ডীর বাড়িতে ভাঙচুর হলে সরকার বাধা দেয় না। সেই ঘটনার পর কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটি মাস। সরকার কিন্তু একজনকেও গ্রেফতার করেনি। যারা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তাদের আরও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সংবাদপত্র অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে যারাই কথা বলেছে, সরকারের প্রশয়কারীদের বিরুদ্ধে একটি শব্দ যারা কথা বলেছে, তাদের পরিণতি হয়েছে ভয়ঙ্কর। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে চলছে ক্ষমতার দখলের লড়াই। সবাই সবার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অনেকে বলছে, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার স্ক্রিপ্ট তৈরি হয়েছিল বিদেশের মাটিতে। ঘটনা হল, বাংলাদেশেই তৈরি হয়েছিল ধ্বংসযজ্ঞের পাণ্ডুলিপি। এতদিন সেই পাণ্ডুলিপি দেখা যায়নি, ক্ষমতা দখলের লডা়ই সেই পাণ্ডুলিপিকে প্রকাশ করেছে।
গত ১৭ মাস ধরে বাংলাদেশে চলেছে সংগঠিত সহিংসতা। মবকে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, গণপিটুনি, পত্রিকার দফতরে আগুন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা ধারাবাহিকতা। এই ধারাবাহিকতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি রাষ্ট্রের বিলুপ্তি। মবকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউনূস চালাচ্ছেন ক্ষমতার ট্রেন। আর তাঁকে সরাতে কয়েকটি পক্ষ বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে মাহমদুর রহমানের একটি উক্তি স্মর্তব্য। তিনি বলেন, ‘যে নির্বাচনে ওসমান হাদি না, সেই নির্বাচন দিয়ে আমরা কি করবো? হাদির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন নির্বাচন খেলা চলতে পারে না। ’
এই উক্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে রাষ্ট্রের মধ্যে দিয়েছে কয়েকটি গোষ্ঠী যারা ক্ষমতা কেড়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। যেভাবেই হোক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার এক অদৃশ্য লড়াই শুরু হয়েছে। ব্যক্তি খুন যে কোনও দেশেই হয়ে থাকে। পার্থক্যটা গড়ে দেয় সেই খুনে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গী। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন বোঝা যায় যে রাষ্ট্র আর ক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না। সংবাদপত্র অফিসে হামলা, ভাঙচুর, লুঠপাঠ আসলে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক দিল।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post