মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে বড় বাণিজ্য চুক্তি সেরে ফেলল ভারত। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে স্পষ্ট বার্তা দিল যে ভারত এই মুহূর্তে বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক বড় শক্তি। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দাবি করে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ভারত নিজের শর্তে অনড়। এখন জানা যাচ্ছে, আপাতত মিনি বাণিজ্য চুক্তি হতে পারে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে, কারণ এখনও সব বিষয়ে সমঝোতা হয়নি। এদিকে গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়ে গেল। যার ফলে লাভবান হতে চলেছে ভারত। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, ২০২০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর এটিই কোনও দেশের সঙ্গে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক চুক্তি। বছরে ৩,৪০০ কোটি ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের চুক্তি হয়েছে বলে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। কেন এই বাণিজ্য চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা একবার জেনে রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি এই চুক্তি কি কি বলা আছে, সেটাও জেনে নেওয়া যাক।
কয়েক বছর ধরেই ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। দীর্ঘ আলোচনার শেষে গত ৬ মে ভারত এবং ব্রিটেনের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা শেষ হয়। এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিটেন সফরে যাওয়ার পর চূড়ান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর হল। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল এবং ব্রিটেনের বাণিজ্যমন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে ভারত থেকে রফতানি হওয়া প্রায় ৯৯ শতাংশ পণ্যই ব্রিটেনের বাজারে বিনাশুল্কে প্রবেশ করবে। উল্টোদিকে ব্রিটেন থেকে ভারতের বাজারে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে ভারত ধাপে ধাপে শুল্ক কমিয়ে আনা হবে। ব্রিটেনের বাজারে কৃষিজাত এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য এবং চিংড়ি, টুনা মাছ-সহ বিভিন্ন সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য বিনা শুল্কে ব্রিটেনের বাজারে আমদানি করতে পারবে ভারতীয় রফতানিকারকরা। এছাড়া রেডিমেড পোশাক, ভারতীয় বস্ত্র, জুতো, মূল্যবান রত্ন, গহনা, সামুদ্রিক খাবার এবং প্রযুক্তিগত পণ্য আরও বেশি করে ব্রিটেনের বাজারে রফতানি করতে পারবে ভারত। উল্টোদিকে ভারতের বাজারে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে ব্রিটেনের খাদ্য এবং পানীয় প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি। মূলত ব্রিটেনের স্কচ হুইস্কি ভারতের বাজারে আরও সুবিধা পাবে। কারণ, এখনও পর্যন্ত ব্রিটেনের স্কচ হুইস্কির উপর ভারতীয় বাজারে ১৫০ শতাংশ হারে শুল্ক নেওয়া হয়। নতুন চুক্তিতে এই শুল্ক প্রথম ধাপে কমিয়ে অর্ধেক করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী পরে আরও শুল্ক কমাবে ভারত।
ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন দুই দেশেরই প্রধানমন্ত্রী। নরেন্দ্র মোদি বলেন, এই চুক্তির ফলে ভারতের তরুণ প্রজন্ম, কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র-কুটির ও মাঝারি শিল্পের সঙ্গে জড়িতেরা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে এই ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে অনেকগুলো দেশকে বার্তা দেওয়া গেল। বিশেষত যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নেটো গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলি ভারতের ওপর বাড়তি শুল্ক চাপানোর হুমকি দিচ্ছে, তখন ভারত ও ব্রিটেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করলো। এর ফলে ভারত থেকে রফতানি হওয়া প্রায় ৯৯ শতাংশ পণ্যই ব্রিটেনের বাজারে বিনাশুল্কে প্রবেশ করতে পারবে। যা ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিকে আরও চাপে রাখবে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এবার নিজেদের শর্ত নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে। কারণ, ভারত নিজের বাজার বড় করছে, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সেরে ফেলেছে ভারত। চিনের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা চাপে রয়েছে। তাই ট্রাম্প আরও মরিয়া হয়ে উঠেছেন ভারতের বাজারে প্রবেশ করতে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ব্রিটেনের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হওয়া বাংলাদেশের জন্য আরও বিপদ বাড়ালো। কারণ, ভারতের রেডিমেড পোশাক, অন্যান্য পোশাক, চামড়ার জুতো, ব্যাগ ব্রিটেনের বাজারে আরও সস্তা হয়ে যাবে শুল্কহীন হয়ে যাওয়ায়। ফলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুই রফতানি বাণিজ্য ব্রিটেনের বাজারও হারাবে। ইতিমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক চাপানোয় বাংলাদেশ কার্যত বিপর্যস্ত। এবারে তাঁদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিল ভারত। বলা ভালো এক ঢিলে অনেক পাখি মারলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।











Discussion about this post