দীর্ঘ কয়েক দশকের শৈত্য কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে ভারত ও চীনের সম্পর্ক। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ শুরু হয়েছে। এমনকি দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা বিমান যোগাযোগ চালু হয়েছে। পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক হচ্ছে তা বোঝাতে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন ড্রাগন ও হাতি এবার একসাথে নাচবে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ যদি একে অপরের হাত ধরাধরি করে বাণিজ্যিক দিক থেকে এগিয়ে যায় তাহলে দুই দেশের অর্থনীতি আরও দৃঢ় হবে বলে ওই চিঠিতে জানিয়েছিলেন চিনা প্রেসিডেন্ট। কিন্তু এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গোয়েন্দা রিপোর্ট সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে, তাতে ভারত ও চিনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আরও বাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কূটনৈতিক মহলের মতে এটাও একটা ভূ-রাজনৈতিক খেলা। আসুন বিষয়টি একবার বিশদে আলোচনা করা যাক।
সম্প্রতি আমেরিকার এক শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্তা দাবি করেছেন, ভারতের নাকের ডগায় গোপনে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা করেছিল চিন। তাও সেটা ২০২০ সালের জুনে গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিন সেনার রক্তক্ষয়ী হাতাহাতির সাত দিন পর। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনা সেনার মধ্যে হাতাহাতিতে ২০ জন ভারতীয় জওয়ান শহিদ হন। চিনেরও বহু সেনা হতাহত হয়েছিলেন তবে সেটা বেজিং আজও প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন সূত্র ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া তথ্য অনুযায়ী চিনের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা শতাধিক। সে যাই হোক, সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই, গালওয়ান সংঘর্ষের মাত্র এক সপ্তাহ পরে ২২ জুন চিন এই গোপন পারমাণবিক পরীক্ষাটি চালিয়েছিল বলে দাবি করেছেন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওই শীর্ষস্থানীয় কর্তা। যা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছে।
২০২০ সালের ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনা সেনার মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল তা ইতিহাসের পাতায় একটা কালো অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত। ভারত ও চীন সীমান্তে দুই দেশের সৈন্যরা অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারবে না। এমনই একটি চুক্তি রয়েছে। ফলে সেই সংঘর্ষ হয়েছিল বিনা অস্ত্রে। খালি হাতে বা লাঠি, ইট, পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তাতেই হতাহতের সংখ্যা বিশ্বকে অবাক করেছিল। সম্প্রতি জেনেভায় রাষ্ট্রপুঞ্জের এক সম্মেলনে এই বিস্ফোরক দাবি করেছেন থমাস ডিনানো নামে আমেরিকার এক শীর্ষস্থানীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আধিকারিক। তিনি এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, চিন ২০২০ সালের ২২ জুন শিনজিয়াং প্রদেশের লপ নুর এলাকায় গোপনে একটি পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা করেছিল। এলাকাটি চিন-ভারত সীমান্তের অত্যন্ত কাছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছেন, এটা সত্যি হলে তা শুধুমাত্র ভারত নয়, সামগ্রিক ভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সঙ্কেত। ওই মার্কিন কর্তার দাবি, চিন ‘ডিকাপলিং’ নামে এক বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল সেই পারমাণবিক পরীক্ষা করার জন্য। এই পদ্ধতিতে মাটির অনেক গভীরে বিশাল গহ্বর তৈরি করে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এর ফলে পরমাণু বোমা ফাটার ফলে যে ভূকম্পন হয়, তার তীব্রতাও কমে যায়। এতে আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থার রাডারে ধরা পড়ে না। ওই মার্কিন কর্তা এও দাবি করেছেন, চিন যে এমন কিছু করতে পারে তার আঁচ তাঁরা পেয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা হল, এটা ফাঁস হল ছয় বছর পর। যা নিয়ে কূটনৈতিক মহলের একাংশ এবার প্রশ্ন তুলছেন।
আমেরিকার দাবি, আন্তর্জাতিক মহলের নজর এড়াতে এবং ‘কমপ্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার টেস্ট ব্যান ট্রিটি’ বা সিটিবিটি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে বাঁচতেই এই গোপন পথ বেছে নিয়েছিল বেজিং। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ছয় বছর পরে কেন এই দাবি করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র? গালওয়ানের ঘটনা অতীত, বেজিং ওই এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে। ভারত ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। এই পরিস্থিতিতে আচমকা মার্কিন কর্তার ওই দাবি নতুন করে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করছে।
গত বছর জুনে ভারতের অপারেশন সিঁদুরের পর চিন নাকি পাকিস্তানকে তাদের স্যাটেলাইট ইমেজেনারি মাধ্যমে সাহায্য করেছিল। তবুও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন তিনি নাকি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ থামিয়েছেন। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, গালওয়ান সংঘর্ষ এবং তার পরবর্তী উত্তেজনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল চিন। যখন গোটা বিশ্বের নজর ভারত-চিন সীমান্তের দিকে, সেই সুযোগে চিন গোপনে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা ঝালিয়ে নিয়েছে। যদিও আমেরিকার এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘মিথ্যা প্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে বেজিং। তাঁদের দাবি, পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে আমেরিকা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দায় এড়াতে চিনের উপরে দোষ চাপাচ্ছে। যদিও ভারত সরকার এ বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে মনে করা হচ্ছে, এটা ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার একটা প্রচেষ্টা মাত্র।












Discussion about this post