ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে ‘একঘরে’ করতে চেয়েছিল আমেরিকা। চাপানো হয়েছিল একাধিক নিষেধাজ্ঞা। ফলে রুশ অর্থনীতি অনেকটাই তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল। সেখানে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। সমস্ত নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে রাশিয়া থেকে নিরিবিচ্ছিন্নভাবে অপরিশোধিত তেল কিনে রাশিয়ার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে দিলেছিল ভারত। এমনটাই অভিযোগ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। আর এর জেরেই তিনি ভারতের উপর খড়গহস্ত হয়ে চড়া ট্যারিফ চাপিয়েছিলেন। আরও অনেকগুলি পদক্ষেপ নিয়ে কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ভারত যেন রাশিয়ার থেকে তেল না কেনে। কিন্তু মার্কিন রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে টালবাহানা করে ভারত নিজের কাজ নিরবে চালিয়ে যায়। এবার ভ্লাদিমির পুতিনের পালা। ৪ ডিসেম্বর রুশ প্রেসিডেন্ট ভারতে এলেন। দুদিনের সফরে তিনি ভারতকে শুধু ধন্যবাদই জানাননি সঙ্গে এক ঝুড়ি উপহারও দিয়ে গেলেন। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে দুটি বিষয়। একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যটি অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সমঝোতা। যা মার্কিন আধিপত্যকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
রাশিয়ায় তৈরি অস্ত্রশস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে প্রযুক্তির প্রয়োজন, এবার থেকে তা তৈরি করবে ভারত। দুই দেশই এ ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের অধীনে এ দেশে রুশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের যাবতীয় প্রযুক্তি এবার ভারতেই তৈরি হলে তা হবে ভারতের কাছে উল্লেথযোগ্য উন্নতির সূচক হবে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। আবার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই চুক্তি ভারতের সামরিক শক্তি আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল। যেমন, এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, সুখোই ফাইটার জেট ছাড়াও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রয়েছে এই তালিকায়। ভারতীয় সেনাবাহিনী যে সব প্রযুক্তি বা অস্ত্র ব্যবহার করে, তার বেশিরভাগই রাশিয়ায় তৈরি। ফলে সেই অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়, তা এত দিন রাশিয়া থেকে আনাতে হতো। এতে সময় এবং খরচ দুটিই বাড়ে। এবার এই সমস্যা মিটে যাবে। জানা যাচ্ছে, এসইউ-৫৭ পঞ্চম প্রযুক্তির স্টেলথ ফাইটার জেট এবং এস-৫০০ এয়ার ডিফেন্স নিয়েও নাকি রাশিয়ার সাথে আলোচনা শুরু করেছে নয়া দিল্লি। নতুন সমঝোতা পত্রে স্বাক্ষর, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র আওতায় সামরিক সরঞ্জাম যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনে জোর দেওয়া হয়েছে।
এবার আসা যাক অর্থনৈতিক সমঝোতার দিকে। ২০২০ সালে ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলার। পরবর্তী ৫ বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চ মাসের মধ্যে যা এসে তা দাঁড়িয়েছে ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলারে। ভারত মাত্র ৪.৮৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য পাঠায় পুতিনের দেশে। অন্যদিকে, প্রায় ৬৩.৮৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রাশিয়া থেকে ভারতে আসে। এর মধ্যে বেশিরভাগই অপরিশোধিত তেল। ফলে দুদেশের বাণিজ্যে একটা বিপুল ঘাটতি রয়েছে। এবার এটা ব্যালেন্স করার জন্য ভারত ও রাশিয়া একমত হয়েছে। সবচেয়ে বড় পদক্ষেপটি হল, রাশিয়ার SBER BANK ভারতের NIFTY 50 সূচকের সাথে যুক্ত একটি মিউচুয়াল ফান্ড চালু করা। যা রাশিয়ান বিনিয়োগকারীদের ভারতের ইকুইটি বাজারে সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ করে দেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ভারত ডলারের পরিবর্তে রাশিয়ার থেকে রুপিতে তেল কেনে। যেহেতু রাশিয়া ভারত থেকে কম সামগ্রী আমদানি করে সেহেতু সেই রুপি খরচ করার সুযোগ কম। ফলে রাশিয়ার কাছে বিপুর পরিমান ভারতীয় রুপি জমে গিয়েছে। এবার সেই সঞ্চিত এবং উদ্বৃত্ত ভারতীয় রুপি ব্যবহার করার জন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় রুপি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ডলার বা ইউরোতে রূপান্তর করা যাচ্ছে না। এবার রাশিয়া নতুন চালু হওয়া নিফটি ৫০-ভিত্তিক মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিনিয়োগ পণ্যের মাধ্যমে ভারতীয় আর্থিক বাজারে উদ্বৃত্ত ভারতের রুপি ফিরিয়ে দেবে। এতে ভারতের শেয়ার বাজার আরও চাঙ্গা হবে। রাশিয়া চাইছে দুদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০৩০ সালের মার্চ মাসের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে। আর এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য স্থানীয় মূদ্রা অর্থাৎ রুশ রুবল ও ভারতীয় রুপিতে হলে ডলারের পতন অবশ্যম্ভাবী। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একছত্র আধিপত্যে এক চরম চপেটাঘাত। পাশাপাশি, ভারত ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ভারতের এত ভারী মাত্রায় অস্ত্রশস্ত্র কেনা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটা নতুন মাত্রা আনতে চলেছে। একদিকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ অন্যদিকে চিনকেও বড় বার্তা দেওয়া হল বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post