বাংলাদেশের রাজনীতির আঙিনায় চোখ রাখলে দেখা যাবে সে দেশের প্রতিটি দলের বিরুদ্ধেই সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছে। যে দেশে খুন গনহত্যা সাধারণ ঘটনা। রাজনীতির অবক্ষয় রুখতে বারবার গনঅভ্যুত্থান। কিন্তু কখনই তার জন্য কোন ঘোষনাপত্রের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু ২৪এর গনঅভ্যত্থানের পর কেন জুলাই সনদ বা জুলাই ঘোষনাপত্রের প্রয়োজন হল। কেন প্রতিটি অভ্যুত্থানের পর দেশ যে পথে চলে তার উল্টো পথে চলছে ইউনূসের বাংলাদেশ। প্রায় অর্ধেক ভোটারের দল আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়া এই অভ্যুত্থানটি ক্রমেই জনসমর্থন হারাচ্ছে। কিন্তু এটিই কি মূল কারণ। না তা নয়,এর সঙ্গে যুক্ত আছে গভীর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, এবং ষড়যন্ত্রের অন্ধকার ইতিহাস। আর সেই ষড়যন্ত্রের ইতিহাস এতটাই প্রকোট হয়ে পড়েছে যে, জুলাই আন্দোলোনে রাস্তায় হাঁটা কট্টোর সমর্থকও, তার সমর্থন নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। কোথাও গিয়ে তার মনে হচ্ছে তিনি বোধয় ভুল করেছেন। আর এই সন্দেহ শুধু সাধারণ মানুষের মনেই জাগছে না। আন্দোলোন নেতৃত্ব দেওয়া নেতা নেত্রীরাও নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছে। জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে নিজের অভিমত দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান।যিনি আবার আওয়ামীলীগের কঠোর সমালোচক। গত মঙ্গলবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণাপত্র পাঠ করার পর তিনি এক ফেসবুক পোস্টে এ অভিমত জানান।
ফেসবুক পোস্টে বার্গম্যান লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আজ “জুলাই ঘোষণাপত্র” পাঠ করেছেন। এই ঘোষণাপত্র নিয়ে আমার প্রাথমিক মতামত হলো :
এই ঘোষণাপত্রে তুলে ধরা ইতিহাসের বেশির ভাগ অংশ—একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নিয়ে বর্ণনা অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও একতরফা। যাঁরা আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করেন, এতে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। এই ঘৃণা দলটি সরকারে থাকা কালে যা করেছে শুধু সে জন্য নয়; বরং দলটি সম্পর্কে তাঁদের মনোভাবের জন্য—এটাকে একটি রাজনৈতিক বৈরিতা বলা যায়। ঘোষণাপত্রের অনেকটাই পড়ে মনে হয়, যেন এটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের বিরোধী ও সমালোচকদের লেখা একটি রাজনৈতিক বক্তব্য।
সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে এই ঘোষণাপত্রে যে রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক বয়ান তুলে ধরা হয়েছে, তা ১৯৭১ সালের যুদ্ধ নিয়ে আওয়ামী লীগ যে রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক ইতিহাস ব্যবহার করেছিল, তার চেয়ে বেশি সমস্যাজনক হতে পারে। আওয়ামী লীগের সময়েই তাদের ওই ইতিহাস নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। এই ঘোষণাপত্র অতিমাত্রায় পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক একটি ইতিহাসের বর্ণনাকে সরিয়ে, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক পক্ষপাতমূলক আরেকটি বর্ণনাকে প্রতিষ্ঠা করছে। কে জানত, ৫ আগস্ট আসলে সেটি নিয়েই ছিল।
ইতিহাসের এই বয়ানে নিচের বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়েছে, ত্রুটি রয়েছে এবং ভুল উপস্থাপনা করা হয়েছে :
—ঘোষণাপত্রে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকালকে শুধু একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশালের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। যুদ্ধপরবর্তী জাতি গঠনে আওয়ামী লীগ যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল, সেগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে।
এতে বরং ১৯৭১–পরবর্তী ‘জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার’ দায় ‘সংবিধানের খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া ও কাঠামোর দুর্বলতার’ ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের যতটা সফল হওয়ার কথা ছিল, ততটা না হওয়ার পেছনে নিঃসন্দেহে অনেক কারণ রয়েছে। তবে আমি কখনোই শুনিনি, সংবিধানের ‘খসড়া তৈরি’ ও ‘কাঠামো’ সেসব কারণের একটি। (আমার মনে হয়, ‘সংবিধান নিয়ে’ এই বিতর্ক উঠে এসেছে বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছ থেকে। বাংলাদেশে তারা এখন ক্ষমতাশালী এবং নতুন একটি সংবিধানকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য কারণ খুঁজে বের করতে চায়)।
ঘোষণাপত্রে ১৯৭৫ সালের আগস্টে সেনাসদস্যদের হাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের ১৬ জন সদস্যের হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়নি। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর ধরে সামরিক শাসন শুরু হয়েছিল।
ঘোষণাপত্রে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত মুজিব–পরবর্তী সময়ে যখন জিয়াউর রহমান (যিনি পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতা হন) ক্ষমতায় ছিলেন, ওই সময়টাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। আর এটাকে সাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে ‘সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব’ হিসেবে, যা ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তনের’ পথ সুগম করেছিল। এটি সেই সময়ের অতিমাত্রায় বিএনপিপন্থী বর্ণনা।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘১/১১’—যখন ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সরিয়ে সামরিক বাহিনী–নিয়ন্ত্রিত সরকার এসেছিল, তা ছিল ‘ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থার’ ফল । প্রকৃতপক্ষে এটি হয়েছিল বিএনপি সরকার যখন নির্বাচনে কারচুপি করার চেষ্টা করছিল। আর এই কারচুপি থামানোর একমাত্র পথ ছিল সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ। দৃশ্যত সে সময় এ সিদ্ধান্ত খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।
ঘোষণাপত্রের আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ১/১১–এর পেছনের ‘ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থা’ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিল । তবে ২০০৯ সালের নির্বাচনে কিছু কারচুপির ঘটনা ঘটলেও এই নির্বাচনকে সাধারণত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। সে সময় স্পষ্টভাবেই আওয়ামী লীগ ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় দল (২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি তাদের সুনাম হারিয়েছিল)।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল তা উল্লেখ না করে ঘোষণাপত্রে এই ধারণা দেওয়া হয়েছে যে ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে দলটি ‘ফ্যাসিবাদী, অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী’ ছিল । এটি একেবারেই অসত্য। বাস্তবতা হলো, ক্ষমতায় থাকার সময় যতই গড়িয়েছিল, ততই অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ সরকার।
ঘোষণাপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকালকে সম্পূর্ণরূপে একটিমাত্র দিক দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের উপস্থাপন কোনো বৈধ নথির চেয়ে সাধারণত বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রচারণামূলক লেখায় দেখা যায়।
তাই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালের বর্ণনা দিতে গিয়ে ঘোষণাপত্রে এই বিশেষণগুলো ব্যবহার করা হয়েছে: ‘গণবিরোধী’, ‘স্বৈরাচারী’, ‘মানবাধিকারবিরোধী’, ‘মাফিয়া ও ব্যর্থরাষ্ট্র’, ‘সীমাহীন দুর্নীতি’, ‘ব্যাংক লুট’ এবং অনুসরণ করা নীতিগুলো ‘প্রাণবৈচিত্র্য ও জলবায়ুকে বিপন্ন করছে’। এই বর্ণনাগুলোর কয়েকটি অবশ্যই সত্য। কিন্তু ঘোষণাপত্রে আওয়ামী লীগের অন্য আরেকটি দিক পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারীশিক্ষা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রকৃতপক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্য অর্জন করেছিল তারা। আওয়ামী লীগ সরকারে থাকাকালে একই সঙ্গে দুটি বয়ানই ছিল। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইতিবাচক বয়ানগুলোকে ছাড়িয়ে যায় নেতিবাচক বয়ান।
ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে ‘যেহেতু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগণ গত প্রায় ষোলো বছর যাবৎ নিরন্তর গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করে জেলজুলুম, হামলা-মামলা, গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।’ ঘোষণাপত্রে বর্ণনা করা এসব ঘটনা ঘটেছিল, তবে এখানে যেভাবে অতিরঞ্জিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, সেভাবে ঘটেনি।












Discussion about this post