বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত নাম অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। তিনি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য ছিলেন। গত বছর শেখ হাসিনা জমানার শেষ দিকে তাঁকে উপচার্য পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। সেই সময় থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কলিমুল্লাহ সাহেব। কারণ সেও সময় তিনি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক সমালোচনা করতেন। বাংলাদেশ গণমাধ্যমেও তাঁর বহু সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে সে সময়। এরপর মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলেও তিনি সরব ছিলেন। বিশেষ করে ইউনূসের বিদেশনীতি, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক দূরবস্থা নিয়ে তিনি যেমন সরব ছিলেন, তেমনই খড়্গহস্ত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা সমন্বয়কদের প্রতি। ফলে পুরোনো এক মামলায় তাঁর মতো শিক্ষাবিদকে গ্রেফতার করায় যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে। কেউ কেউ বলছেন, অধ্যাপক কলিমুল্লাহ বহু দিন ধরেই টার্গেট ছিলেন। এবার দুর্নীতি মামলাকে হাতিয়ার করেই তাঁকে গ্রেফতার করা হল। অর্থাৎ সরকার বিরোধী কথা বলায় তাঁর মুখ বন্ধ করা হল। তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কারাগারে পাঠান। কেন অধ্যাপক কলিমুল্লাহ গ্রেফতার হলেন? এই প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল স্বভাবতই দ্বিধাবিভক্ত।
আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের আইনজীবী দাবি করেন, অধ্যাপক কলিমুল্লাহ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রী হল ও একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট নির্মাণে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মূল অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী ৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের চুক্তি করার ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু উপচার্য থাকাকালীন অধ্যাপক কলিমুল্লাহ-সহ অন্যরা ৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের চুক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনও অনুমোদন নেননি। অর্থাৎ দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এক বছরের বেশি সময় আগের অভিযোগ ঘিরে চলতি বছরের জুন মাসে কেন মামলা দায়ের হল? অনেকেই মনে করছেন, এর পিছনে অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে। ২০২৫ সালের ৬ জুলাই এক মারাত্মক মন্তব্য করেছিলেন অধ্যাপক কলিমুল্লাহ। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সেটা ফলাও করে ছেপেছিল। তিনি বলেছিলেন, “মব ঘাড়ের ওপর ঝুলছে—যে কোনও সময় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে”। সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, ‘সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হুদার ওপর যে হামলা ও অবমাননা হয়েছে, তা অনেককেই স্তম্ভিত করেছে। বাংলাদেশের মব সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর আক্রমণাত্মক মন্তব্য ছিল, ‘দেশের পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও নির্ভয়ে বক্তব্য রাখতে পারছেন না। অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমেই আক্রমণাত্মক প্রচারণা, চরিত্র হনন এবং হুমকির সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মনে করা হচ্ছে, এ রকম চাছাছোলা ভাষায় ইউনূসের প্রশাসন ও জাতীয় নাগরিক পার্টিকে আক্রমণ করার পর থেকেই তিনি টার্গেট হয়ে যান। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, অধ্যাপক কলিমুল্লাহকে গ্রেফতার করে ইউনূস সরকার বাকি সমালোচকদের বার্তা দিতে চাইল। যাতে তাঁরাও সমালোচনার রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ান। কিন্তু হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। কলিমুল্লাহ যদি দুর্নীতি করেই থাকেন তাহলে তাঁকে কেন শেখ হাসিনার সমালোচনা করার পরও গ্রেফতার করেনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। আবার মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারও কেন এক বছর অপেক্ষা করলেন? আসলে এই মুহূর্তে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে ইউনূস ও তাঁর দোসরদের। তাই গায়ের জোরে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার রাস্তায় হাঁটছে তাঁরা।












Discussion about this post