এই মুহূর্তে যাবতীয় চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নেপালের উদ্ভুত পরিস্থিতি। তবে এই আলোচনায় বারবার চলে আসছে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ, বলা ভালো মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশের প্রসঙ্গ। কেন বাংলাদেশের প্রসঙ্গ চলে আসছে, সেটা বুঝতে গেলে আগে জানতে হবে নেপালে কেন গণঅভ্যুত্থান হল? নেপালের গণঅভ্যুত্থান কি বাংলাদেশের মতোই পরিস্থিতিতে হয়েছে?
গত বছর মাঝামাঝি বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ একটা আন্দোলন শুরু করেছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার দাবিতে। আচমকা জুন-জুলাই মাসে তা পরিবর্তিত হয়ে যায় সরকারবিরোধী বা হাসিনা হঠাও আন্দোলনে। যদিও কোটা ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার নির্দেশিকা জারি করেছিল হাসিনা সরকার। কিন্তু বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তা আবার পুনর্বহাল হয়। আদালতের নির্দেশে কোটা ব্যবস্থা ফিরলো, কিন্তু ছাত্র সমাজের ক্ষোভ বাড়ল হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে। আর তাতেই ভিত নড়ে যায় আওয়ামী লীগ সরকারের। গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। নেপালের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন, গণতন্ত্র, ধর্মনিরেপক্ষতা সরিয়ে নেপালে পুরোনো রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিতে একটা আন্দোলন চলছিলই। সেটাই আচমকা মোড় নেয় নেপাল সরকার ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার ঘোষণায়। আশ্চর্যজনকভাবে নেপালের ওলি সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয় সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনেই। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও নেপালে দু জায়গাতেই সরকার সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনেছিল। কিন্তু কোপ পড়ল সরকারের ঘাড়ে। এক্ষেত্রে একটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, বাংলাদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং সরকার পরিবর্তনের খেলায় মার্কিন ডিপ স্টেটের ভূমিকা এখন ওপেন সিক্রেট। তাহলে কি নেপালেও ডিপ স্টেট নাকি অন্য কোনও দেশের গুপ্তচর এজেন্সির হাত রয়েছে? বিশ্লেষকরা এখন শুধু বলছেন, বাংলাদেশ বা নেপাল, ছকটা কিন্তু এক ও অদ্বিতীয়।
ছক এক হলেও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারি শাসকের তকমা দিয়ে গদিচ্যুত করা হয়েছিল। নেপালের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সরকারকে দুর্নীতির দায়ে দায়ি করা হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের যে বক্তব্য সামনে এসেছে, তাতে একটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে তা হল নেপালের রাজনীতিবিদদের সমুদ্রসমান দুর্নীতির অভিযোগ। সরকার পক্ষ হোক বা বিরোধী পক্ষের রাজনীতিবিদদের পরিবারের বিপুল অর্থ-সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি। আর নেপালী যুবক-যুবতীরা কর্মহীন, গরিবীয়ানার মধ্যে পড়ে রয়েছেন। এখানে একটা ন্যারেটিভ তৈরি করা হচ্ছে যে জেন-জে বা প্রযুক্তির মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সোশ্যাল মাধ্যম বন্ধ করার ফলেই ক্ষেপে উঠেছে। কিন্তু তাঁদের ক্ষেপানো হয়েছে, এটা এখন স্পষ্ট। যেমনটা ক্ষেপানো হয়েছিল বাংলাদেশের ছাত্রসমাজকে। দুর্নীতি সব দেশেই কমবেশি আছে। তা বলে এত কম সময়ে এত বড় অভ্যুত্থান হওয়া কি সম্ভব? এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন অভিজ্ঞ মহল।
আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। সেটা হল ওলির নেপালের মতো অবস্থা হবে না তো ইউনূসের বাংলাদেশের? বিশেষজ্ঞরা এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তুলনামূলক আলোচনা করলে বোঝা যাবে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অবস্থাও নেপালের মতোই। এক বছরেই পাহাড় প্রমান দুর্নীতির অভিযোগে ডুবেছে ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টারা। মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের জন্য সেরকম কোনও আর্থিক প্যাকেজ বা বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে আসতে না পারলেও নিজের নামে থাকা যাবতীয় মামলা খারিজ করিয়েছেন প্রভাব খাটিয়ে। এমনকি নিজের এবং তাঁর সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে থাকা বিপুল কর মকুব করেছেন নিজেরই আদেশে। সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা নিজের কোম্পানিগুলিকে পাইয়ে দিয়েছেন। আর বাংলাদেশের জনগণ, ছাত্রসমাজকে ডুবিয়ে রেখেছেন আন্দোলন, সংঘর্ষ ও লড়াইয়ের মধ্যে। শিক্ষাব্যবস্থা শিকেয় তুলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শুধুই রাজনীতি ও বিক্ষোভ-সংঘর্ষ। পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শতাধিক কারখানায় তালা ঝুলেছে, কর্মহীন লক্ষেরও বেশি। এছাড়া অন্যান্য কল-কারখানাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জিডিপি কমেছে অবিশ্বাস্যভাবে, বেকারত্ব বেড়েছে সেই তুলনায় অনেকটাই। বাংলাদেশের একটা ছোট অংশের মানুষজন বিপুল ক্ষমতা হাতে নিয়ে জনগণের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। আর বড় অংশের মানুষ তাঁদের পায়ের তলায় আটকে হাঁসফাঁস করছেন। ফলে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর দোসর এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগেরও উত্থানও হচ্ছে ক্রমশ। সবমিলিয়ে নেপালের ওলির মতো বাংলাদেশের ইউনূসের বিরুদ্ধেও একটা বড়সড় বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটলে কেউ অবাক হবেন না।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post