সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত হতে চলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না খেলতে আসার যে কারণ দেখানো হয়েছিল তা কার্যত বিশ্বের চোখে ধুলো দেওয়ার একটা মাধ্যম। ভারতে বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা জনিত অভাবের কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বকাপ খেলতে অস্বীকার করে। যার ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা আইসিসি বাংলাদেশকে বাদ দিয়েই আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। তবে নিরাপত্তা জনিত আশঙ্কা সঠিক তথ্য নয় আসলে বাংলাদেশ পাকিস্তানের কথায় নেচে ভারতকে বয়কট করার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এই কান্ড ঘটিয়েছে। পাকিস্তানও আসলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কেবলমাত্র ভারতের ম্যাচ বয়কট করছে তাও তাঁরা জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশকে সমর্থন করার জন্য। এত কথা বলার প্রয়োজন হল শুধুমাত্র এটা বোঝাতে যে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ রাজনীতি যেদিকে এগোচ্ছে তাতে পাকিস্তান ফের বাংলাদেশের উপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করেছে। এটা নিঃসন্দেহে ভারতের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে
এই আবহে ই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে যে প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ার ব্যাপারে অনেকখানি অগ্রগতি হয়েছিল তা আপাতত ঠান্ডা ঘরে। কিন্তু ওয়াকিবহালমহল মনে করছে আসন্ন নির্বাচনে যদি পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায় আসে তাহলে, এই প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া অনিবার্য। কাউকে বলে দিতে হবে না বাংলাদেশে এই মুহূর্তে পাক-পন্থী রাজনৈতিক দল হল জামায়াতে ইসলামী। তাদের সঙ্গে জোট বেঁধেছে আরো বেশ কয়েকটি ইসলামিক রাজনৈতিক সংগঠন এবং ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি। এরা প্রত্যেকেই পাকিস্তানপন্থী। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চাইছে এই জোট ক্ষমতায় আসুক। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে বহুল চর্চিত এই প্রতিরক্ষা চুক্তি অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে ইউনুসের সরকার। তবে বাংলাদেশের অন্যান্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বিরোধের কারণে পাকাপাকি চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। যা একমাত্র সম্ভব হবে জামাত জোট যদি বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসে। এর জন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না ইউনুস সরকার। বিষয়টি ভারতের জন্য অবশ্যই উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের ফলে হাসিনা সরকারের পতন হয়। বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় আসে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তারপর থেকেই উল্লেখযোগ্য হারে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পাল্লা দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে ইউনুসের বাংলাদেশ। নেপথ্যে জামাতের কলকাঠি। বিএনপি এবং তাঁদের মতো কয়েকটি রাজনৈতিক দল পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানায়। ফলে সেই চুক্তি এখন আপাতত ঠান্ডাঘরে। কিন্তু এই চুক্তি নিয়ে এত কেন চর্চা চলছে? কি বলা হচ্ছে এই চুক্তিতে?
একাধিক সূত্র বলছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে প্রথমেই বলা হয়েছে এক দেশের উপর কোনও তৃতীয় শক্তি আক্রমণ করলে অন্য দেশ সেটাকে নিজের উপর আক্রমণ হিসাবে দেখবে। অর্থাৎ ভারত যদি পাকিস্তানে আক্রমণ করে তাহলে বাংলাদেশ সেটা নিজেদের উপর আক্রমণ হিসেবে দেখবে আবার উল্টোটাও হতে পারে। এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু ভারতের মাথাব্যথার কারণ অন্য জায়গায়। প্রতিরক্ষা চুক্তির বলে পাকিস্তান বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার উর্বর জমি হিসাবে ব্যবহার করতে পারে। পাকিস্তান বাংলাদেশ তাদের সৈন্য সমাহার থেকে শুরু করে বিমানঘাঁটি অথবা নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। এর অর্থ হল যে কোন সময় পাকিস্তান ভারতের পূর্ব প্রান্তে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে আক্রমণ করতে পারে। আবার এই চুক্তির ফলে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্স হুমকির মুখে পড়তে পারে। সেটাই ভারতের কাছে এখন অন্যতম মাথা ব্যাথার কারণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
আরব দুনিয়ার অন্যতম এক সংবাদ মাধ্যম মিডেল ইস্ট নিউজ সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তার শিরোনাম হল “বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক ভারতে উদ্বেগের ঘণ্টা বাজাচ্ছে”। বোঝাই যাচ্ছে এই প্রতিবেদনে ভারতের উদ্বেগের বিষয়গুলি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল অসীম মালিক বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এটি ছিল পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই-এর প্রধানের প্রথম এ ধরনের সফর। আইএসআই প্রধানের এই সফরের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা। অন্যদিকে ২০২৫ সালের আগস্টে, পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় ভ্রমণ করেন, যা ১৩ বছরের মধ্যে পাকিস্তানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর ছিল। আবার পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খানও বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নিতে এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে বাংলাদেশ সফর করেন। উল্টোদিকে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসানের নেতৃত্বে পাকিস্তানে একটি উচ্চ পর্যায়ের সামরিক প্রতিনিধিদল পাঠায়, যা কয়েক বছরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বিনিময়গুলির মধ্যে একটি। এই বছরেই পাকিস্তান বাংলাদেশকে তাঁদের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির জন্য আলোচনা চালিয়ে গিয়েছে এমনকি কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ওই চুক্তিতে ৪৮ ইউনিট জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যেই পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঢাকা সফর করেন এবং প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। সবমিলিয়ে বিষয়টি ভারতের জন্য খুবই সংবেদনশীল এবং উদ্বেগজনক।
রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর সমর্থনকারী রাজনৈতিক দলগুলি যতই আস্ফালন করুক না কেন, পরিস্থিতি এবং কূটনৈতিক দক্ষতা সবই তাদের বিপক্ষে। বাংলাদেশ যতই পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে নানা সমঝোতা করে ভারতকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করুক তা আদৌ বাস্তবায়ন হবে এমন সম্ভাবনা কম। গোটা পরিস্থিতি এখন নির্ভর করছে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে জামাত জোট কতটা সুবিধা করতে পারে তার ওপর। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভোট পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নয়াদিল্লি নতুন কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতেই পারে। সেটা বাংলাদেশের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না এমনটাই বিশ্বাস ওই মহলের।












Discussion about this post