একটা বিষয়ের মধ্যে ভীষণ মিল, সেটা হল গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের জবরদস্তি পতনের প্রায় ১৪ মাস পর গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রথমেই তিনি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। একমাসের মাথায় প্রথমবার মুখ খুললেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। তিনিও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দিলেন। উল্লেথযোগ্য মিল হল দুজনেই বর্তমান শাসক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। যা বিশ্ব শান্তির জন্য নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য খুব একটা সুখকর নয়। এর মধ্যে কি কোনও মিল রয়েছে? তা নিয়ে নিশ্চই চর্চা চলবে। তবে আগে একটু দেখে নেওয়া যাক, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষোভ ঠিক কোথায়। কাকে কাকে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছেন।
প্রথমেই বলেছি, রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি মূলত প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তবে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু যে সময়ে এই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সেটাও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রয়টার্সে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। জানানো হয়েছে, তিনি হোয়াটসঅ্যাপে এই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এর অর্থ হল তাঁর সঙ্গে কোনও মিডিয়ার প্রতিনিধিদের যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না, এমনকি তাঁর প্রেস উইংকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও খুবই স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু রয়টার্সকে বলেছেন, “আমার কণ্ঠস্বর দমিয়ে রাখা হয়েছে”। আবার তিনি বলেছেন, নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দ্বারা তিনি অপমানিত বোধ করছেন। এটা নিশ্চই মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য ভালো বিজ্ঞাপন হবে না। অন্যদিকে আরও তিনি জানিয়েছেন, মুহাম্মদ ইউনূস তাঁকে একপাশে সরিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ, গোটা চাপটাই এখন নোবেলজয়ীর ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সে দেশের সেনাপ্রধানকে নিয়েও কিছু মন্তব্য করেছেন। সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
রয়টার্স দাবি করেছে, ঢাকায় তাঁর সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন থেকে হোয়াটসঅ্যাপে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। তাঁদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম কোনও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, “যদি তাঁরা আমাকে বলে যে তাঁরা তাঁদের নিজস্ব রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার পরিকল্পনা করছে, তাহলে আমি সরে যাব”। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আসলে তিনি এটা বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী চাইছে মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করতে। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে বহু চর্চিত। ঘুরিয়ে সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও এবার সেই কথাই বলে দিলেন। রাষ্ট্রপতি আরও বলেছেন, ইউনূস প্রায় সাত মাস ধরে তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি, এমনকি তাঁর প্রেস বিভাগও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আবার গত সেপ্টেম্বরে, বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলি থেকে তাঁর ছবিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এটা তাঁর কাছে যথেষ্ট অপমানজনক বলেও মন্তব্য করেছেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। অর্থাৎ, তাঁর অভিযোগের তির মুহাম্মদ ইউনূসের দিকে। কিন্তু সেনাবাহিনী নিয়েও রাষ্ট্রপতি মুখ খুলেছেন।
রাষ্ট্রপতি চুপ্পু বলেছেন, তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখছেন। এমনকি তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন বাংলাদেশের তিন বাহিনীর প্রধানও। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে হাসিনার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বিক্ষোভের সময় একপাশে সরে দাঁড়িয়েছিল সেনাবাহিনী। সেটাই হাসিনার ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল। যদিও শাহাবুদ্দিন রয়টার্সকে বলেছেন, জেনারেল ওয়াকার উজ জামান নাকি তাঁকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ক্ষমতা দখলের কোনও ইচ্ছা তাঁর ছিল না। উল্লেখ্য, বর্তমান বাংলাদেশে হাসিনা আমলের কোনও কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মত বঙ্গভবনে থেকে যান রাষ্ট্রপতি মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাঁকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। যদিও তিনি একবার দাবি করেছিলেন, যে শেখ হাসিনার কোনও পদত্যাগপত্র তিনি হাতে পাননি, বা তাঁর কাছে এসে পৌঁছয়নি। এরপরই বঙ্গভবনে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির অভিমানের কারণ যে সেনাপ্রধানও, সেটাও ঘুরিয়ে বলে দিয়েছেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। আর পরবর্তী নির্বাচন হয়ে গেলেই তিনি সরে যেতে চান সেটাও স্পষ্ট করেছেন।












Discussion about this post