ঢাকার আকাশে এক আশ্চর্য নীরবতা। শহরের আলো ম্লান হলেও প্রতিরক্ষা দফতরে স্যাটেলাইট কন্সুলে জলজল করছে একবিন্দু আলো। চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে একটি মার্কিন নৌসেনার জাহাজ। সরকারি ভাষ্যে বলা হচ্ছে একটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ। যদিও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে পাওয়া খবরে জানা যাচ্ছে, মহরার প্রকৃত উদ্দেশ্য একেবারেই মানবিক নয়। এটি কৌশলগত অবস্থা নিশ্চিত করার প্রস্তুতি।
এই প্রসঙ্গে ২০১৯-য়ে ২৮ জুন তৎকালীন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য ব্র্যাড শেরম্যান বলেছিলেন যে দেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, সেই বাংলাদেশের সঙ্গে রাখাইন যুক্ত করাই যৌক্তিক। তখন বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু ছয় বছর বাদে সেই বক্তব্যের বাস্তব রাজনীতির রাডারে ফিরে এসে নতুন প্রেক্ষাপট, যার নতুন একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। ২০১৯ সালের ২৮ জুনের সেই শুনানী ছিল নীরব ভূমিকম্প। চট্টগ্রামে মার্কিন নৌসেনার জাহাজের উপস্থিতি কেবল মানবিক নয়। এটি বঙ্গোপসাগরে আমেরিকা সামরিক নেটওয়ার্কের অংশ। এই মহরা আসলে সফট মিলিটারি এক্সপ্যানসন যা বাংলাদেশকে সে দেশের অজান্তে নতুন এক জিও স্ট্র্যাটেজিক খেলায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
ভারতীয় প্রতিরক্ষা মহলের আশঙ্কা, চট্টগ্রাম বন্দরে মার্কিন উপস্থিতি স্থায়ী হলে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষত ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তের কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হবে। কিছু ভারতীয় বিশ্লেষকের মতে, এই মহড়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার ইন্দোপ্যাসেফিক কমান্ড ইন্দোপ্যাকম নেটওয়ার্কের এক্সটেনশন তৈরি করেছে, যেখানে বাংলাদেশ পরিণত হতে পারে এক ফরোয়ার্ড অপারেটিং মোড। এই তত্ত্ব ভারতের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ মানবিক উদ্যোগ। ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের সহায়তায় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ। তবে কৌশলগত মহরার প্রকৃতভাব অনেক গভীর। রাখাইন এখন ভৌগলিক সংঘাতের কেন্দ্র। আরাকান সেনা জুনতা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ভেঙে অর্ধেক অঞ্চল নিজেদের দখলে রেখেছে।
তাই, নীরব কূটনীতি, ভারসাম্যের কৌশল এবং সুযোগের জন্য অপেক্ষা করাই শ্রেয় হবে। ভূরাজনীতিতে যে কোনও সময় অঘটন ঘটতে পারে। সাম্প্রতিক অতীতের কিছু ঘটনা তার প্রমাণ। আজ যেগুলি দৃশ্যমান সেগুলির শিকড় হয়তো এক দশক বা তারও বেশি সময় আগে রোপণ করা হয়েছিল। ডিপ স্টেট বা রাষ্ট্রের গভীর কৌশলগত কাঠামো এমনভাবে পরিকল্পনা তৈরি করে যার ধীরে ধীরে একটা মহড়া বা একটি চুক্তি বা একটি সীমান্ত সংঘাতের মধ্য দিয়ে ঘটে। আর এই পরিকল্পনার সব চেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর গতি সবসময় নীরব। রাখাইনে সেটাই হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চিন এবং ভারত প্রত্যেকেই জানে মিয়ানমারে পশ্চিম সীমান্ত এখন শুধু একটি মানবিক সংকট নয়, বরং একটি স্ট্র্যাটেজিক করিডোর, যা উত্তরদিকের প্রবেশপথে সেই নিয়ন্ত্রণ নেবে। দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য ও জ্বালানি পথের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। তাই, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি মহরা প্রতিটি রাজনৈতিক বিবৃতি, এমনকি প্রতিটি মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সবই এই বৃহত্তর নীল নকশার অংশ।
রাখাইন সীমান্তে আরাকান আর্মির পতাকা উঠেছে আর ওয়াশিংটনের মানচিত্রে নতুন রেখা টানা হচ্ছে। ঢাকা নীরব, দিল্লি অস্বস্তিতে আর সময় ধীরে ধীরে সাজিয়ে নিচ্ছে তার কৌশল। প্রশ্ন একটাইই। এই পরিকল্পনার শেষপ্রান্তে কি বাংলাদেশের মানচিত্র বদলে যাবে ? সমুদ্র যেমন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বালুকাবেলায় আকৃতি পাল্টায়, তেমনই ইতিহাস বদলায় পরিকল্পনার গহীনে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post