ভারতের চাল নাকি?
বাংলাদেশের পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর দেড় মাস বাকি। এর মধ্যেই বাংলাদেশে ক্রমাগত বিদেশি জঙ্গি-জিহাদি নেতাদের আনাগোনা বেড়ে চলেছে। এতদিন দেখা গিয়েছিল, বাংলাদেশে অবাধে ঘুরে ধর্মপ্রচার এবং জঙ্গিবাদ প্রচার করে যাচ্ছিল পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের শীর্ষ জঙ্গিনেতারা। এবার দেখা গেল আফগানিস্তান থেকে তালিবান সরকারের এক শীর্ষ নেতা বাংলাদেশে পৌঁছে গেলেন। আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফার্স্ট পলিটিক্যাল ডিভিশনের মহাপরিচালক নূর আহমাদ নূর এখন বাংলাদেশে রয়েছেন। অথচ এই খবর অন্তর্বর্তী সরকারের পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দাদের কাছেই নেই। এমনকি বাংলাদেশের আফগান দূতাবাসও নাকি এ কথা জানে না। শীর্ষ তালেবান নেতা মোল্লা নূর আহমেদ নূর যিনি মোল্লা জাওয়ান্দি নামেও পরিচিত। এই ব্যক্তি তালিবান সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যে শান্তি আলোচনা হয়েছিল তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যদিও সেই আলোচনা ভেস্তে গিয়েছে। এখনও পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এ হেন শীর্ষ তালিবান নেতা ঢাকায় আসা নিয়ে জোর চর্চা চলছে কূটনৈতিক মহলে। প্রসঙ্গত, পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে কয়েকজন বাংলাদেশি তরুণ নিহত হওয়ার খবর সে দেশের সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা সকলেই জানি। পাকিস্তানে নিষিদ্ধ সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের বা টিটিপি-র হয়ে তাঁরা আফগানিস্তান পৌঁছে গিয়েছিলেন দুবাই ঘুরে। সেবারই প্রথম বাংলাদেশ যে জঙ্গি-জিহাদিদের কারখানা হয়ে উঠছে এমন অভিযোগ প্রথম সামনে আসে। গোটা ঘটনায় আফগানিস্তানের তালিবান শাসকদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছিল পাকিস্তান। কারণ তেহরিক-ই-তালিবান আফগানিস্তান থেকেই তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাঁদের লড়াই মূলত পাকিস্তানের সঙ্গেই। সে সময় অভিযোগ উঠেছিল, বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলি থেকে মগজধোলাই করে তরুণদের দুবাই হয়ে আফগানিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার একটা বড় চক্র কাজ করছে। যারা টিটিপি বা অন্যান্য নিষিদ্ধ সংগঠনের জন্য প্রশিক্ষিত হয়। এই আবহেই তালিবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম রাজনৈতিক বিভাগের মহাপরিচালক মোল্লা নূর আহমেদ নূর ঢাকায় এলেন, একের পর এক বৈঠক করছেন বাংলাদেশের কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠনগুলির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন কাওমি মাদ্রাসা পরিদর্শন করছেন। অথচ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার জানেই না বিষয়টি। অথচ, বিমান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২১ ডিসেম্বর রাত ১১:৪৫ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মোল্লা জাওয়ান্দি ঢাকায় পৌঁছান। জানা গিয়েছে, তিনি ঢাকায় কিছু রাজনৈতিক ও মাদ্রাসা-ভিত্তিক গোষ্ঠীর সাথে বৈঠক করেছেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও রয়েছেন। বৈঠকে মাদ্রাসা শিক্ষক এবং বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক উপস্থিত ছিলেন। নিষিদ্ধ হরকাত-উল-জিহাদের সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে তাঁর আশেপাশে দেখা গিয়েছে। তালিবান মন্ত্রী মোল্লা জাওয়ান্দি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আবু সায়েম খালেদের জামিয়া কারামিয়া মাদ্রাসাতেও গিয়েছিলেন। পাশাপাশি ঢাকার ফরিদাবাদ মাদ্রাসা, মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসাতেও তাঁকে দেখা গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক-সহ সাতজন ইসলামপন্থী নেতা আফগানিস্তান সফর করেছিলেন। তখন তাঁরা তালিবান সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন বলে জানা গিয়েছিল। এটা তাঁরই পাল্টা সফর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নূর আহমাদ নূরকে বাংলাদেশ সরকারিভাবে আমন্ত্রণ জানায়নি। সে কারণে তার এই সফরকে ‘ব্যক্তিগত’ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, তালিবান সরকারের এই শীর্ষ মন্ত্রী কেন আচমকা বাংলাদেশ সফরে এলেন? কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর এখন পর্যন্ত রাশিয়া ছাড়া আর কোনও দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে ভারত-সহ কয়েকটি দেশ তালিবান সরকারকে স্বীকৃতি না দিলেও তাঁদের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ রেখে চলে। সম্প্রতি তালিবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ভারত সফর করে গিয়েছেন এবং একাধিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতাও হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁর সফর ছিল সরকারি। তালিবান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফার্স্ট পলিটিক্যাল ডিভিশনের মহাপরিচালক নূর আহমাদ নূর বাংলাদেশে আসা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে। পাকিস্তানের উপর চাপ সৃষ্টি করতেই কি তাঁকে ঢাকা পাঠানো হল? এই প্রশ্নটাও উঠছে। কারণ, এই মুহূর্তে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক মোটেই ভালো না। এই পরিস্থিতিতে খেলাফত মজলিস, হরকত উল মুজাহিদের মতো বাংলাদেশের কয়েকটি কট্টরপন্থী সংগঠনের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করেছে। তাহলে কি ভারতের পাল্টা চালেই তালিবান সরকার এবার বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইছে?












Discussion about this post