মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তরবর্তীকালীন সরকার যবে থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসেছে, তবে থেকেই বাংলাদেশ যত ভারতবিরোধী মনোভাব নিচ্ছে, ততই বেশি পাকিস্তান প্রেম উথলে উঠছে সে দেশে। যদিও কোনও দেশের সরকার পরিবর্তন হলে তাঁদের কূটনৈতিক ভূমিকার বদল হতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশে যা ঘটেছে সেটা স্বাভাবিক নয়, সেখানে সরকার পরিবর্তন ছিল এক মেটিকুলাস ডিজাইন বা গভীর ষড়যন্ত্র। এটা রচনা করাই হয়েছিল ভারতকে চাপে রাখতে। তাই বাংলাদেশের এই পাকিস্তান প্রেম ভারতের জন্য ছিল একটা গভীর চিন্তার বিষয়। আজ সেই চিন্তা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।
ঠিক এই অবহেই দিল্লি বিস্ফোরণের ঘটনা এবং তাতে বাংলাদেশের যোগসূত্র ভারতকে ইউনূস নেতৃত্বধীন সরকার প্রসঙ্গে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান নিতো। সে সময় বহু জঙ্গি নেতা ও সন্ত্রাসের মদতদাতাকে জেলে পুড়েছিল হাসিনা সরকার। এমনকি ভারতীয় গোয়েন্দাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে নিয়মিত ১ব্যবস্থা নিত বাংলাদেশ পুলিশ। ফলে ভারত নিশ্চিত ছিল অনেকটা। কিন্তু হাসিনার বিদায় এবং মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসায় ভারতের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত পাল্টা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে বাংলাদেশের উপর। পাশাপাশি বাংলাদেশ সীমান্ত জুড়ে ভারত সামরিক বন্দোবস্ত বাড়াতে শুরু করেছে। বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেককে ঘিরে।
এবার বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে দিল্লি ডেকে কার্যত আলটিমেটাম দিয়ে দিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। গত বুধবার হওয়া এই বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে যাবতীয় তথ্য প্রমাণ শুধু তুলে দেওয়া হয়নি, আরও দুটি শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য। এরমধ্যে প্রধান শর্ত হল অবিলম্বে বাংলাদেশের মাটিতে চলা জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবিরগুলি নির্মূল করতে হবে। যেটা জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে আইএস নিয়ন্ত্রিত ও প্রশিক্ষিত প্রায় আশিজন জঙ্গি ৮৪টি ক্যাম্প থেকে তাঁদের কার্যকলাপ চালাচ্ছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির তরফে জোগাড় করা তথ্য, ছবি ও ভিডিও খলিলুর রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ভারত ওই সমস্ত জঙ্গি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলির লোকেশন, উপগ্রহ চিত্র সবই দিয়েছে। এগুলি অবিলম্বে বন্ধ করে ওই আইএস জঙ্গিদের গ্রেফতার করতে বলা হয়েছে। এটা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তি অনুসারেই দাবি করা হয়েছে, যা লঙ্ঘন করা মানে কার্যত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। পাশাপাশি ভারত ড. খলিলুর রহমানকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, বলা ভালো শর্ত দিয়েছে আসন্ন নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূল হতে হবে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ-সহ সমস্ত রাজনৈতিক দলকে অংশগ্রহনের সুযোগ দিতে হবে। এটা না হলে ভারত সেই নির্বাচন মানবে না। এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। জানা যাচ্ছে খলিলুর রহমান এ বিষয়ে অজিত ডোভালকে জানিয়েছেন যে তিনি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে জানাবেন এবং এই ডসিয়র তাঁর হাতে তুলে দেবেন, বাকি সিদ্ধান্ত নেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
ডোভাল-খলিলুর বৈঠকে সদ্য সাজাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের প্রত্যর্পন নিয়েও কথা হয়। খলিলুর সাহেবই বিষয়টি তুলেছিলেন। জানা যাচ্ছে, অজিত ডোভাল তাঁকে সপাটে উত্তর দিয়েছেন। ডোভাল স্পষ্ট জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা না আসাদুজ্জামান কেউই পালিয়ে ভারতে এসে আশ্রয় নেয়নি। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সেনার হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমানে ভারতে আসেন। অর্থাৎ তাঁর ভারতে আসার সিদ্ধান্ত সরকার টু সরকার ছিল। পাশাপাশি ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তাই শেখ হাসিনা যেমন রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে এসেছিলেন, তেমনই রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবেই ভারতে রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার যেন সঠিক পদ্ধতি মেনেই যোগাযোগ করে। পাশাপাশি অস্ট্রিয়ার হেগ শহরে যে আন্তর্জাতিক আদালত রয়েছে সেটা নিয়েও ভারতের অবস্থান ডোভাল সাহেব খলিলুর রহমানকে জানিয়ে দিয়েছেন। সবমিলিয়ে বল এখন মুহাম্মদ ইউনূসের কোর্টে। তাঁর এগোলেও বিপদ এবং পিছলেও বিপদ।












Discussion about this post