তাহলে কি আসন্ন ভোটে জামাতের সঙ্গে বিএনপি’র সমঝোতা হচ্ছে? তারেক রহমানকে কি জামাত নেতা শফিকূর রহমানের হাত ধরাধরি করে আসন্ন ভোটে অপশক্তির বিরুদ্ধে লডা়ই করবেন? পদ্মাপারের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যে দিকে বইছে, তাতে এই সমীকরণ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে দুই নেতার মুখোমুখি বৈঠকের পরে তো কোনওভাবেই নয়। আর সব কিছুই হচ্ছে কিন্তু জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে।
এই যেমন আমাদের বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক করেন সে দেশের কয়েকজন উপদেষ্টাদের সঙ্গেও। এই নিয়ে ইতিমধ্যে পদ্মার দুই পারে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এমনকী আন্তর্জাতিকমহলেও শুরু হয়েছে চর্চা। জয়শঙ্করকে বাংলাদেশ পাঠিয়ে সাউথব্লক বিরাট একটা কূটনৈতিক বার্তা দিয়ে রাখল। জয়শঙ্করের তদারকি সরকার প্রধানের মুখ দর্শন না করাটাও একটা বার্তা। সাউথব্লক এতোদিন ঘুরিয়ে বার্তা দিয়েছে যে তদারকি সরকারকে তারা স্বীকৃতি দিচ্ছে না। আর ইউনূসের সঙ্গে জয়শঙ্করের সাক্ষাৎ না হওয়াটা সেই বার্তায় পড়ল সিলমোহর। কূটনৈতিকমহল বলছে, এই বার্তাটা দেওয়ার দরকার ছিল। কারণ, একটা সরকার যেভাবে ভারত-বিরোধিতার স্পনসরার হয়ে গেল, তাতে ভারত এর থেকেও আরও কঠিন পদক্ষেপ করতে পারত। সেটা যে করেনি, তার জন্য ইউনূসকে ভাগ্যবান বলতে হয়। এই অবস্থায় তারেকের সঙ্গে বৈঠক করলেন জামাত নেতা শফিকুর রহমান।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামাত নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে পাকিস্তান সেনার পক্ষে কাজ করেছিলেন। দলের একাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে রাজাকার ঘাতকবাহিনীর নেতা হিসাবে গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। হাসিনা জমানায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে কয়েক জনের সাজাও হয়। ২০১৩ সালে জামাতের ভোটে লড়ার উপর বিধিনিষেধ জারি করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৬ সালে সে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাদের নির্বাচনী প্রতীক বাতিল করে দেয়। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সরকার ‘মৌলবাদ ও স্বাধীনতা বিরোধী’ জামাত এবং তাদের শাখা সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ৫ অগস্ট বাংলাদেশে পালাবদলের পরে বদলে যায় পরিস্থিতি। এখন তারা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ‘অন্যতম চালিকাশক্তি’ হিসাবে পরিচিত।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন তিনি। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জামাত নেতা বলেন, ‘বেগম জিয়া গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য আজীবন লড়াই করে গেছেন। তিনি ইতিহাসের বিরল সম্মান নিয়ে বিদায় নিয়েছেন, যা তাঁর প্রাপ্য ছিল। আমরাও যদি জাতির জন্য এমন অবদান রাখতে পারি, তবে আমরাও একই সম্মান পাব।’
জামাতের পরিচয় তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। একসময় বাংলাদেশে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জামাত ছিল তাদের সহযোগীদল। পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে ফাটল ধরে। একে অপরের রাজনৈতিক শত্রুতে পরিণত হয়। বৃহস্পতিবার তারেকের সঙ্গে বৈঠকের পর জামাত প্রধান বলেন, “ অতীতে একসঙ্গে কাজ করেছি। ভবিষ্যতেও করব। পাঁচটা বছরের জন্য জাতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে, একটি সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বার্থে আমরা সবাই মিলেমিশে ভালো কোনও চিন্তা আমরা করতে পারি কি না, সেটাও আমাদের ভাবা দরকার। আমরা এটাও বলেছি, নির্বাচনের পরে পরেই সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা আলোচনায় বসব। কথা বলব খোলা মনে। চিন্তা করব জাতির জন্য। সিদ্ধান্ত নেব জাতির জন্য। ”
নির্বাচন প্রসঙ্গে তাঁর প্রতিক্রিয়া, “আমরা চাই নির্বাচন যেন সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও স্বচ্ছ হয়। একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরাতে আমরা বদ্ধপরিকর। ”
জিয়ার মৃত্য নিয়েও কথা বলেন জামাত নেতা শফিকুর। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “তাঁর বিদেশে চিকিৎসার জন্য বারবার আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু যখন অনুমতি দেওয়া হল, ততদিনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। ”












Discussion about this post