বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনার দলকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করল।যতদিন না বাংলাদেশের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার সম্পন্ন হবে, ততদিন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ থাকবে আওয়ামী লীগের কার্যকলাপ। কিন্তু বাংলাদেশের পূর্বের রেকর্ড ঘাটলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত যে সমস্ত দলগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাদের শক্তি ক্ষয় হয়নি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এবার কি বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের শক্তির সম্পূর্ণভাবে ক্ষুন্ন হতে চলেছে? কোন দিকে এগোবে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রশ্ন হাজার তবে উত্তর অধরা।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবি উঠে আসছিল। গত কয়েকদিনে তা আরও জোরালো হয়। গত তিনদিন ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং বাংলাদেশের অন্যান্য দলের নেতারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ দাবিতে শোরগোল ফেলে দেয় বাংলাদেশ জুড়ে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে শুক্রবার থেকে কর্মসূচি ও নেওয়া হয়। ‘শাহবাগ ব্লকেড’ নামে ওই কর্মসূচিতে হৈচৈ করে যাই বাংলাদেশে। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনুসের বাসভবনে বিক্ষোভ শুরু করে কিছু ছাত্রনেতা। তারপরই বিক্ষোভকারীদের আশ্বস্ত করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিষয়টিকে অতি গুরুত্ব আকারে দেখা হচ্ছে বর্তমান সরকারের তরফে, সেটা আগেই বোঝা গিয়েছিল। তবে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তেই তড়িঘড়ি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা। বৈঠক শেষ হবার পরেই তদারকি সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, আওয়ামী লীগের কার্যকলাপকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। তিনি জানান, শনিবার বৈঠকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনী অনুমোদিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেকোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে শাস্তি দিতে পারবেন। এমনটাই জানিয়ে একটি বিবৃতি জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। জানানো হয়, সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য এবং আপামর বাংলাদেশের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য, এবং জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে নিরাপত্তা এবং অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
উল্লেখ্য,আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিলো ১৯৪৯ সালে এবং এর পর থেকে আওয়ামী লীগ এ ভূখণ্ডে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবেই পরিচিতগত প্রায় সাত দশকেরও বেশী সময় ধরে। এ দলটির নেতৃত্বেই স্বাধীনতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
সে দেশের টানা ১৫ বছরেরও বেশী সময় ক্ষমতায় থাকার পর গত বছর জুলাই এ ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনাসহ দলের বেশীরভাগ নেতাই ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশের মধ্যে আটক হয়ে কারাগারে আছেন শীর্ষনেতা, সাবেক মন্ত্রী ও এমপি ছাড়া দলটির কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েরও বহু নেতা।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এর আগে জামাতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার আমলে কোনভাবেই তাদের বাড়তে দেওয়া হয়নি। কিন্তু তারপরে তাদের কি শক্তি ক্ষয় হয়ে গিয়েছে? এর কারণ শেখ হাসিনার জামানার শেষ হতেই তারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাতে থেমে থাকেনি, তারা যেভাবে সংগঠন মজবুত করছে এবং সরকারের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে, তাতে এটা স্পষ্ট হচ্ছে, শক্তি ক্ষয় তাদের হয়নি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। এতদিন ধরে সঞ্চিত শক্তি একটু একটু করে রাজনীতির আঙিনায় ব্যবহার করছে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও কি সেটাই ঘটতে চলেছে? অন্যদিকে আরও একটি তত্ত্ব খাড়া করছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। জাতীয় নাগরিক পার্টি বা ছাত্র নেতাদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিত্ব নিজেদের স্বার্থ পূরণ করার চেষ্টা করছেন? এই প্রশ্ন উঠে আসছে।
আবার বেশ কিছু বিশ্লেষকরা দাবি করছেন , দল হিসেবে সংকটে পড়া এবং সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার অভিজ্ঞতা আওয়ামী লীগের আছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তান সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করলেও বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনে সফল হয়েছিল আওয়ামী লীগ ।
আবার ১৯৭৫ এ বাংলাদেশের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বড় ঝড় আসে দলের অভ্যন্তরে,দলের নেতারা শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন সামরিক শাসনামলেই।
আবার ১৯৫৭ সালেই পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক চুক্তির জেরে ভাঙ্গনের মুখে পড়েছিলো আওয়ামী লীগ। এছাড়া পঁচাত্তরের পরেও বিভিন্ন সময়ে ভাঙ্গন কিংবা প্রভাবশালী অনেক নেতা দল থেকে বেরিয়ে গেলেও ২০২৪ এর এই অভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিস্থিতিতে হয়তো পড়তে হয়নি আওয়ামী লীগকে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ এর ৫ই আগস্ট কোটা বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যার মাথায় বসানো হয় নোবেল জয়ী মোহম্মদ ইউনুসকে। তারপর থেকেই আওয়ামীলীগ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বাংলাদেশে। তবে বেশ কয়েকটা মাস কেটে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ সক্রিয় হতে থাকে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ভারতে বসে বেশ কয়েকটি ভার্চুয়াল মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি দেশে ফেরার আওয়াজ তোলেন। বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের কর্মসূচি দীর্ঘ এবং সুদূর প্রসারী হতে থাকে। মানুষের সমর্থনও কম নয়। আর এরপরই জোরালো হতে থাকে আওয়ামী লীগকে ঘোষণা করা হবে। এখন দেখার, আওয়ামী লীগ সমস্ত কার্যকলাপ বন্ধ করে দিয়ে তার শক্তি ক্ষয় হয়, নাকি শক্তি সঞ্চয় করে পরবর্তীকালে আরো ভয়ঙ্কর হয়ে দেশে সক্রিয় হয় আওয়ামী লীগ।












Discussion about this post