ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের সাতগাছিয়ায় দলীয় সভা ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেখানে তাঁর কাজ নিয়ে একটি রিপোর্ট কার্ড পেশ করেছেন তিনি। সাংসদ হিসেবে ডায়মন্ড হারবারে কত কাজ করেছেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব দেওয়া রয়েছে এই রিপোর্ট কার্ডে। এই রিপোর্ট কার্ডের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’। ২০১৪ সালে প্রথমবার লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে পা রেখেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর টানা তিনবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন ডায়মন্ড হারবারে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে রেকর্ড ভোটের ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে নজর কেড়েছেন অভিষেক। এবার সামনে বিধানসভা নির্বাচন। আপাতদৃষ্টিতে এই রিপোর্ট কার্ড বিধানসভা নির্বাচনী প্রচার বলে মনে হলেও নামটি কিন্তু সুদূরপ্রসারী। এমনটাই মনে করছেন বঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ কেন? বঙ্গ রাজনীতির সঙ্গে যারা পরিচিত, তাঁরা অন্তত একটি শব্দবন্ধের সঙ্গে পরিচিত। সেটা হল ডায়মন্ড হারবার মডেল। বলা হয়, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তাঁর লোকসভা কেন্দ্রে যে ধরণের উন্নয়নমূলক কাজকর্ম করছেন, সেটা একেবারেই আলাদা। তাঁকেই ডায়মন্ড হারবার মডেল বলে আখ্যা দিয়েছেন অভিষেকের অনুগামীরা। তৃণমূলের অন্দরেই কানাঘুঁষো চলে, অভিষেক এই ডায়মন্ড হারবার মডেলকে গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্বয়ং তাঁর পিসি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে ডায়মন্ড হারবার মডেল শুধুমাত্র ডায়মন্ড হারবারেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, একটা সময় অভিষেক নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে সেই আবহ প্রকাশ্যেই বোঝা যাচ্ছিল আর জি কাণ্ডের পর। আর জি কর কাণ্ডের সময় অভিষেককে খুব বেশি মুখ খুলতে শোনা যায়নি। বরং আর জি করে হামলার সময় তিনি প্রকাশ্যেই কলকাতা পুলিশকে সমালোচনা করেছিলেন। যা নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর ডায়মন্ড হারবার মডেলকে একটি পুস্তিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যার নাম ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’।
তাহলে কি নিঃশব্দেই বঙ্গ রাজনীতিতে কোনও বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে? তৃণমূলের অন্দরে নব্য ও প্রবীনের যে অদৃশ্য লড়াই শুরু হয়েছে, তাতে অচিরেই বড় কোনও পরিবর্তন আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলাতেই তৃণমূলের অন্তত দুটি গোষ্ঠী সক্রিয়। একদিকে বয়স্ক ও প্রায় অথর্ব নেতারা এবং অন্যদিকে নবীন প্রজন্মের নেতৃত্ব। কেউ কাউকে জায়গা ছাড়তে নারাজ। উদাহরণ হিসেবে বীরভূমের অনুব্রত ও কাজল শেখের কথা বলা যায়। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেই প্রবীনদের জায়গায় নবীন ও যুব নেতাদের টিকিট দেওয়ার পক্ষে সাওয়াল করেছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা নাকচ করে দিয়েছিলেন। সেটা নিয়ে অভিষেক ক্ষুন্ন হয়েছিলেন।
এবার সাতগাছিয়ায় তিনি যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন, সেখানে শুধুই তাঁর কাজের খতিয়ান দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ পুস্তিকায় তিনি দাবি করেছেন, ১৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফলতা-মথুরাপুরে একটি জলপ্রকল্প তৈরি হবে। যা দেশের বৃহত্তম জল সরবরাহ প্রকল্পগুলির মধ্যে অন্যতম। উপকৃত হবেন প্রায় ৮ লক্ষ মানুষ। পাশাপাশি বজবজে অত্যাধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরি হচ্ছে। যার সুবিধা পাবেন ডায়মন্ড হারবার লোকসভার অন্তত ৫ লক্ষ মানুষ। অভিষেকের আরও দাবি, ১১৩.৫ লক্ষ টাকা খরচে এলাকার প্রাথমিক স্কুলগুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। ভোকেশনাল শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বানানো হয়েছে পলিটেকনিক কলেজ এবং আইটিআই প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি খেলাধুলার মান উন্নয়নে তাঁর সংসদীয় এলাকায় তৈরি হয়েছে ৩৮টি মাল্টিজিম, ৩ মিনি ইন্ডোর স্টেডিয়াম, ২ খেলার মাঠ তৈরি হয়েছে। ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করেছে ডায়মন্ড হারবার ফুটবল ক্লাব, যা আই লীগ খেলার ছাড়পত্র পেয়েছে।
অর্থাৎ, সাংসদ হিসেবে বিগত ৮ বছরে ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’ ঘটিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাঝ্যায়। সেখানে গোটা রাজ্যে তৃণমূলের উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওঠে দুর্নীতির অভিযোগ, কিন্তু ডায়মন্ড হারবারের কর্মযজ্ঞ নিয়ে নেই কোনও অভাব-অভিযোগ। এটাই বোঝানোর চেষ্টা করলেন কি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক? দলের মধ্যে ফাঁটল ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে। দেওয়াল লিখন কি পড়তে পারছেন তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী?












Discussion about this post