২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকেই পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। বলা ভালো বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গণঅভ্যুত্থানের পর যাদের কাজ ছিল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুর্বহাল করে বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠ, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করিয়ে বাংলাদেশকে স্থিতিশীল একটা নির্বাচিত সরকার উপহার দেওয়া। কিন্তু আদতে হল ঠিক উল্টো। বাংলাদেশ আরও অরাজক এক দেশে পরিণত হল, সেখানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ল, পুলিশ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেল, মবের হাতে দেশ চলে গেল। অভিযোগ, জামাতের নেতৃত্বে কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠনগুলির হাতে তৈরি এই মবের মূলকে আক্রান্ত হলেন আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, সমর্থকরা। সেই সঙ্গে আক্রান্ত হলেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে হিন্দুরা। চোখ বুজে থাকলেন মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি কার্যত জামাতের হাতের পুতুল হয়ে বিগত ১৫-১৬ মাস কাটিয়ে দিলেন। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। গোটা দেশের সিস্টেম, পুলিশ, প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীর একটা অংশের দখল নিয়ে নিয়েছে জামায়তে ইসলামী। ইউনূসের আর করার কিচ্ছুটি নেই। সম্প্রতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক মুজিবুর রহমান হলের নাম বদল করার প্রস্তাব পাস হল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মিটিংয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নামাঙ্কিত ওই ঐতিহাসিক হলের নাম এবার শহিদ ওসমান হাদি হল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। উগ্র ইসলামপন্থী এবং ভারত বিরোধী তরুণ নেতা মাস খানেক আগেই ঢাকার রাস্তায় দিনে-দুপুরে গুলিবিধ্ধ হয়েছিলেন। পরে মারা যান। বঙ্গবন্ধুকে ইসলামপন্থী এই নেতাই যেন প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে বাংলাদেশের এই উগ্র ইসলামিক শক্তি। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এর পিছনে আসল কারণটা হল ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে উগ্র ইসলামিক এক দেশে পরিণত করার নেপথ্য প্রচেষ্টা।
তরুণ নেতা ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক উত্তেজনা একসময় চরমে ওঠে। সে সময় পরিকল্পিতভাবে ভারত-বিরোধী জিগির তুলে দেওয়া হয়েছিল। আবারও আক্রান্ত হয় বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৩২ ধানমণ্ডির বাড়িটি। আক্রান্ত হয়েছিল ছায়ানটের মতো বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কার্যালয়। এছাড়া আক্রমণ শানানো হয়েছিল রাজশাহী ও খুলনায় ভারতের উপ হাইকমিশনের দফতরেও। সবমিলিয়ে সে সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন একেবারেই তলানিতে চলে যায়। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের তরফেই দাবি করা হয়, হাদির খুনিরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছিল। এখন কার্যত বন্ধ ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়াই। অন্যদিকে, হাদির সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ এবং ইসলামিক ঐক্য মঞ্চ মূল অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবিতে এখনও রাজপথে। তাঁদের হুঁশিয়ারি, হত্যাকারীদের ধরা না গেলে তারা নির্বাচন বানচালের পথে নামবেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই সুয়োগকে কাজে লাগিয়ে আসলে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে চাইছে ওই অংশটি। এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ঐতিহাসিক মুজিব হলের নাম বদলে সদ্য নিহত তরুণ নেতার নামে রাখার সিদ্ধান্ত নিল। এ ক্ষেত্রে উল্লেথ করা যেতে পারে, সম্প্রতি বাংলাদেশের ওই প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ দখল করেছে জামায়াতে ইসলামির সংগঠন ইসলামিক ছাত্রশিবির। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের মতে, ওসমান হাদি পৃথক সংগঠন করলেও তার পেছনে মূল প্রেরণা ছিল জামায়াতে ইসলামির। তাই তাঁকে শহীদের মর্যাদা দিতে এত তৎপর জামায়েত। আর এই সুযোগে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টাও করছে জামাতের ছাত্রশিবির। যদিও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত হলের নাম বদলে হাদির নামে রাখার সিদ্ধান্তে অনেকেই বিস্মিত, কেউ কেউ প্রতিবাদও করছেন।
অন্যদিকে, ইসলামি মৌলবাদীদের কোপ পড়ল হিন্দুদের আরেকটি অন্যতম উৎসব মকর সংক্রান্তি বা পৌষ পার্বণে। পৌষ শেষে জমিতে নতুন ধান ওঠার উদযাপন হিসেবে পৌষ পার্বণ উৎসব এতদিন দুই বাংলার বুকেই পালিত হয়ে আসছে। এবার এই আনন্দোৎসবকে এবছর ‘হারাম’ তকমা দিয়ে মকর সংক্রান্তি পালনে ফতোয়া জারি করল ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ইসলামিক কট্টরপন্থীরা। মূলত হিন্দুদের উদ্দেশেই তাঁদের ফতোয়া, নিজেদের এলাকায় কোনওরকম অনুষ্ঠান পালন করা চলবে না। দুই বাংলা এতদিন একসঙ্গে মেতে উঠত নবান্ন উৎসবে। পদ্মাপাড়ে বেশ সমারোহ করেই মকর সংক্রান্তি বা পৌষ পার্বণ পালিত হয়ে আসছে এতদিন। কিন্তু বদলের বাংলাদেশে, মুহাম্মদ ইউনূসের বাংলাদেশে এবার হিন্দুদের যে কোনও উৎসব পালন করতে হয় কড়া নিরাপত্তার মোড়কে। এবছর বাংলাদেশের দিকে দিকে প্রচার চলছে, মকর সংক্রান্তি নাকি ইসলামের পক্ষে হারাম! তাই তাতে অংশ নেওয়া যাবে না। এর জেরে চরম আতঙ্কে সে দেশের হিন্দু সমাজ। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, এতদিন জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশে যা যা ইনভেস্ট করেছে, এবার তার ফসল তোলার কাজ শুরু করল। ভোট যত এগিয়ে আসবে, এ ধরণের নানা ফতোয়া, স্বাধীনতার স্মৃতি মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা সামনে আসবে।












Discussion about this post