বেশ কয়েকদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে নিজের গতিবিধি বাড়িয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। সঙ্গত কারণেই তাঁর গতিবিধি নিয়ে উঠছিল বহু প্রশ্ন, সৃষ্টি হচ্ছিল অসংখ্য গুজবের। কেউ কেউ নতুন করে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব সামনে আনছিলেন। এই আবহে মুখ খুললেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন। সোমবার দুপুরে ঢাকার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিক সম্মেলন করেন মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স। সেখানেই তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনও দলের পক্ষে নয়, তারা বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন চায়।
মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য শোনার পর কূটনৈতিক মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে, আচমকা কেন তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হল, তাহলে কি সত্যিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছিল? ওয়াকিবহাল মহল বলছে, গত বছর জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশে যথন হাসিনা বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, তখন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নাক গলাতে শুরু করে। পিটার হাস, ডোনাল্ড লুয়ের মতো নাম সামনে আসে। আর অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের ভূমিকা ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি যেমন বাংলাদেশের নতুন সরকারের চালিকাশক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়তে ইসলামী এবং বিএনপি নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। তেমনই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গেও একাধিকবার বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি এও জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মাথা কামরুল হাসানের মতো একাধিক সেনাকর্তার সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশে রাখাইন করিডোর নিয়ে তাঁর দৌঁড়ঝাঁপ সকলেই জানেন। নিজেদের গণতন্ত্রের পুজারি বলে দাবি করে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সাপ্তাহিক প্রেস কনফারেন্সেও বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সাংবাদিকদের উপর আক্রমণের প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু সেই প্রশ্ন সুচতুরভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র। বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। এই আবহেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। ভারত, চিন ও রাশিয়া কার্যত একজোট হচ্ছে মার্কিন অগ্রাসন রুখতে। জাপানও যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা দিয়েছে। এই আবহে বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক বেস বা মিয়ানমারের রাখাইন করিডোর নিয়ে ব্যাকফুটে ওয়াশিংটন। ফলে ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনকে পিছু হটতে হল বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে। তাদের প্রত্যাশা, আগামী বছরের শুরুর নির্বাচনটি হবে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে একটি সফল গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হবে, যা বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ নিয়ে প্রবল চাপে পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন বুঝেছে, রাখাইন করিডোর বা সেন্ট মার্টিন হাতে পেতে তাঁদের কালঘাম ছুঁটবে। বাংলাদেশে তাঁদের ফুটপ্রিন্ট আটকাতে ভারত এবার পাশে পাবে রাশিয়া ও চিনকে। নরেন্দ্র মোদি এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে সেই ব্যবস্থা করে এসেছেন। তাই এবার ধীরে ধীরে বাংলাদেশ নিয়ে নিজেদের হাত ধুঁয়ে ফেলতে চাইছে ওয়াশিংটন। ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের বক্তব্য ও অভিব্যাক্তি সেটাই প্রমান করছে।












Discussion about this post