কথায় আছে, “পাপ ছাড়ে না বাপকে”। ভারতের দুই প্রতিবেশী দেশ, একটা পশ্চিম প্রান্তে, অন্যটা পূর্ব প্রান্তে। এই দুই দেশের নির্বাচিত সরকারকে ফেলে পুতুল সরকার বসানোর পরিকল্পনা হয়েছিল সুদূর ১২ হাজার কিলোমিটার দূরে বসে। উদ্দেশ্য, শুধুমাত্র ভারতকে বিপদে ফেলা, ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টি করা বা কোনও ভাবে ভারতকে উস্কানি দিয়ে একটা যুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু প্রথম উদ্দেশ্য সফল হলেও, ভারতকে টলানো যায়নি। উল্টে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সেই ‘বাপ’ ডোনাল্ড লু চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে বিদায় নিলেন দায়িত্ব থেকে। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি।
প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি থেকে ইমরান খান ও শেখ হাসিনাকে সরানোর পরিকল্পনা করেছিলেন ডোনাল্ড লু। যিনি ছিলেন, জো বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেই সঙ্গে তাঁর আরও একটি পরিচয় ছিল, কুখ্যাত সিআইএ এজেন্ট। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ নেওয়ার তিনদিন আগেই গত ১৭ জানুয়ারি তাঁর মেয়াদ শেষ হয়। যিনি বাইডেন প্রশাসনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন, তিনিই কার্যত বিদায় নিলেন একেবারেই নিরবে-নিভৃতে। তাঁর অপসারণের খবর নিশ্চিন্ত করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রকের ওয়েবসাইট। এই ডোনাল্ড লু ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্বপালনের সময়কালে দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে পাকিস্তানে বেশ চর্চিত নাম ছিলেন। কারণ, ২০২২ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ডোনাল্ড লু’র নাম উঠে এসেছিল। কারণ ওই সময় ডোনাল্ড লু পাকিস্তানের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক তত্ত্বাবধানকারী ব্যুরোর নেতৃত্বে ছিলেন। খোদ ইমরান খান এই মার্কিন কুটনীতিককে দায়ি করে সরব হয়েছিলেন তাঁর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কারণ হিসেবে। তবে শুধু পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ডোনাল্ড লুয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জো গুজুরগিরি করতে রাজি না হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই প্রাক্তন সিআইএ এজেন্ট ডোনাল্ড লুকে সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন জো বাইডেন। আর দায়িত্ব পেয়েই নিজের খেল শুরু করেছিলেন ওই কূটনৈতিক। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে হঠানোর জন্য লু প্রধমেই বেনজির ভুট্টো এবং নাওয়াজ শরিফের দলকে প্রলোভন দেখিয়ে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসেন। যারা পাক রাজনীতিতে ইমরানের দল পিটিআই-এর ঘোষিত শত্রু। কিংবদন্তী ক্রিকেটার তথা পাকিস্তানের জনপ্রিয়তম নেতা আগেই সে কথা আঁচ পেয়েছিলেন। তিনি ২০২২ সালের মার্চ মাসেই ডোনাল্ড লুয়ের দিকে আঙ্গুল তুলে দাবি করেছিলেন, তাঁর সরকারকে অস্থিতিশীল করতে উদ্যোগী আমেরিকা। কিন্তু তিনি তা ঠেকাতে পারেননি। প্রায় একই দাবি করছিলেন শেখ হাসিনাও। তিনিও বেশ কয়েকবার দাবি করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর অপসারণের চক্রান্ত করছে। কাকতালীয়ভাবে এক গণ অভ্যুত্থানের জেরে পতন হয় হাসিনা সরকারের। সেই সময়ও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিভাগের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এই ডোনাল্ড লু। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতও জো বাইডেনের প্রশাসনের চোখ রাঙানি এড়িয়ে বহু সাহসী কাজ করেছে। এর জেরে বহুবার যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে হুঁশিয়ারিও দিয়েছিল। কিন্তু ভারত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে অনেকটাই এগিয়ে। পাশাপাশি নরেন্দ্র মোদির ভয়ডরহীন পররাষ্ট্রনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেকটাই থমকে দিয়েছিল। কিন্তু যে সমস্ত দেশ সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে, যেমন বাংলাদেশ ও পাকিস্তান, তাঁদের প্রধানমন্ত্রীদের মার্কিন কুটনীতিকে সামলানো সম্ভব হয়নি। তাই সহজেই ডোনাল্ড লু চক্রান্ত করে এবং টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ফেলে দিয়ে পুতুল সরকার বসিয়ে দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ওই য়ে, সব কুকর্মের ফল এক সময় এসে খারাপই হয়। ডোনাল্ড লুয়ের ক্ষেত্রেও তা হল। তাঁকে এমনভাবে সরতে হল যে এটা তাঁর পক্ষে খুবই অপমানজনক। এমনকি পরবর্তী সময় তাঁকে ট্রাম্পের কোপেও পড়তে হতে পারে বলে দাবি কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের।
প্রসঙ্গত, ডোনাল্ড লু এমন চক্রান্ত করেছিলেন যে ভারতের দুই প্রান্তে দুই দেশে এমন কাউকে ক্ষমতায় আনা যারা চুরান্ত পর্যায়ের ভারতবিরোধী। যাতে এই জেরে ভারতের ভিতরেও অস্থিরতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সবারই একটা বাপ আছে, যেমন নরেন্দ্র মোদি, যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মোদি যেমন কৌশলী চালে পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে সামলে যাচ্ছেন, তেমনই ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই যুক্তরাষ্ট্রের বদনামের ভাগীদার সব কূটনৈতিকদের সরিয়ে দিচ্ছেন নির্বিচারে। ফলে প্রবল চাপে পড়েছেন পাকিস্তানের শাহবাদ শরীফ এবং বাংলাদেশের মুহাম্মদ ইউনূস।











Discussion about this post